মার্কিন পতন আর ভারতের উত্থান! বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ বদলের হুঙ্কার জাতিসংঘের!

বিশ্ব রাজনীতিতে খুব দ্রুত পালাবদল ঘটছে। একদিকে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব ও আধিপত্য দুর্বল হয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারত নিজের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে চলেছে। ফিনান্সিয়াল টাইমস-কে দেওয়া এক অত্যন্ত বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে ঠিক এই কথাই স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ভারতকে একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ‘বৈশ্বিক মধ্যম শক্তি’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি জানিয়েছেন যে, বিশ্বমঞ্চের ক্ষমতার ভারসাম্য এখন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে গুতেরেস সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে জানিয়েছেন যে, ওয়াশিংটনের নীতি ও অনড় অবস্থানের কারণে জাতিসংঘের স্বাভাবিক কাজকর্ম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বারবার সংস্থার বাজেট ছাঁটাই করা হচ্ছে, যার ফলে যে মূল আদর্শ ও উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মতে, আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের মতো মহাশক্তিধর দেশগুলো নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ আর একরোখা মনোভাব জোর করে বাকি বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় এমন বহু উদীয়মান দেশ রয়েছে যারা দ্রুত উন্নতি করছে, অথচ আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণে তাদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে এই বৈষম্য।
বিশ্ব শান্তি রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সুশাসন বজায় রাখতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ (IMF)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমূল পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছেন গুতেরেস। তাঁর সাফ কথা, বিশ্বকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করতে হলে এই সংস্থাসমূহের পুরনো কাঠামোগত পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি এবং নতুন উদীয়মান শক্তিগুলোকে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সমান সুযোগ দিতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘পিস বোর্ড’ কখনোই জাতিসংঘের কোনো বিকল্প হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
চলমান বৈশ্বিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে গুতেরেস অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে সতর্ক করেছেন যে, গোটা বিশ্বে বর্তমানে যে জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগের ইউরোপীয় পরিস্থিতির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদ পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারস্পরিক ভেটো ক্ষমতার লড়াই অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সিদ্ধান্তে জল ঢেলে দিচ্ছে। খোদ জাতিসংঘ নিজেই আজ গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বকে নতুন কোনো ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করার মতো কার্যকর পরিকাঠামো বা লোকবল আজ সংকটের মুখে।
১৯৪৫ সালে যুদ্ধ প্রতিরোধ এবং বিশ্বশান্তি পুনরুদ্ধারের প্রধান লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতিসংঘ। যদিও বর্তমান বহুলাংশে অকার্যকর ব্যবস্থায় সেই উদ্দেশ্য সাধনে সংস্থাটি বারবার ব্যর্থ হয়েছে, তবুও গুতেরেস মনে করেন যে জাতিসংঘের কোনো বিকল্প নেই। সীমিত ক্ষমতা সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে এই সংস্থার ঐতিহাসিক প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার, যার মাধ্যমেই জাতিসংঘকে ফের শক্তিশালী ও কার্যকর করে তোলা সম্ভব।