মহৎ কাজ করতে গিয়ে সাড়ে লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ! মৃত বৃদ্ধের পরিবারের ব্ল্যাকমেইলে কীভাবে জীবন বিপন্ন হলো এই নারীর?

চীন থেকে এক অত্যন্ত মর্মান্তিক ও অদ্ভুত ঘটনা সামনে এসেছে, যা সমাজের নৈতিকতা এবং মানুষের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এক সাধারণ মহিলার মানবতা এবং পরোপকার করার মানসিকতা তাঁকে কীভাবে এক গভীর আইনি ও মানসিক বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল, তা জানলে যে কারও চোখ কপালে উঠবে। এক বয়স্ক গ্রাহকের জীবন বাঁচাতে গিয়ে উল্টো নিজের পকেট থেকে ১৯,০০০ ইউয়ান অর্থাৎ প্রায় ২.৬৮ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হন এক পার্লার মালিক। কোন পরিস্থিতিতে একজন পরোপকারী ও দয়ালু নারী অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বাধ্য হলেন এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে সামাজিক চাপে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো, তা একনজরে দেখে নেওয়া যাক।
ঘটনাটি গত ১৭ই আগস্ট চীনের হুনান প্রদেশের। জিয়াও আইহুয়া নামের এক মহিলা একটি মাহজং পার্লার পরিচালনা করেন। লুও নামের ৬০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ সেই পার্লারের নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন। সেদিন হঠাৎ করেই পার্লারের ভেতর লুওর স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটে এবং তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এক মুহূর্তও কালক্ষেপণ না করে জিয়াও মানবতা দেখিয়ে তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসেন। অতিরিক্ত গরম বা সানস্ট্রোকের জেরে এমন হয়েছে ভেবে তিনি লোকটিকে খোলা বাতাসে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেন। যদিও চরম আতঙ্কের মুহূর্তে তিনি সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে ভুলে গেলেও, এক প্রতিবেশী সময়মতো খবর দেওয়ায় অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছায়। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথ পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন, কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
হাসপাতালে বৃদ্ধের মৃত্যুর পরই মৃতের পরিবার এক অপ্রত্যাশিত ও হিংস্র নাটক শুরু করে। পার্লারের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখার অজুহাতে তারা দাবি তোলে যে, পার্লার মালিকের চরম অবহেলা এবং ভুল চিকিৎসার কারণেই লুওর মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তারা পার্লারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে এবং ১ লক্ষ ইউয়ান অর্থাৎ প্রায় ১৪ লক্ষ টাকার বেশি ক্ষতিপূরণ দাবি করে। শুধু তাই নয়, টাকা না দিলে বৃদ্ধের মরদেহ পার্লারের সামনে এনে ফেলে বিক্ষোভ দেখানোর হুমকিও দেয় তারা। এই চরম মানসিক চাপ ও হুমকিতে ভেঙে পড়ে জিয়াও এবং তাঁর স্বামী বাধ্য হয়ে ১৯,০০০ ইউয়ান দিয়ে দেন। এই মানসিক অভিঘাতে জিয়াওয়ের রাতে ঘুম উবে যায় এবং তাঁর শারীরিক অবস্থাও দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে।
অবশেষে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে জিয়াওয়ের পরিবার সমস্ত ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে সেই পোস্ট ইন্টারনেটে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং নেটদুনিয়ায় তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলতে শুরু করেন যে, এমন ঘটনার পর ভবিষ্যতে কেউ আর বিপদে পড়া মানুষের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে সাহস করবে না। জনগণের এই প্রচণ্ড চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত টনক নড়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের। পুলিশ ঘটনার নতুন করে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শুরু করে এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে বৃদ্ধের মৃত্যুটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল। এই মৃত্যুর জন্য পার্লার মালিক জিয়াওয়ের কোনো ধরনের ত্রুটি বা অবহেলা ছিল না।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে চীনের বহুল প্রচলিত ‘গুড সামারিটান’ আইনের কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। এই আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি সম্পূর্ণ সদিচ্ছা নিয়ে বিপদের মুখে পড়া কোনো মানুষের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেন, তবে তাঁকে কোনো ধরনের আইনি বা দেওয়ানি দায় থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেওয়া হয়। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের জোরালো হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত মৃত বৃদ্ধের ছেলে নিজের ভুল বুঝতে বাধ্য হন। পুলিশ এবং স্থানীয় মধ্যস্থতায় পরিবারটি জিয়াওয়ের কাছ থেকে নেওয়া সমস্ত অর্থ সম্পূর্ণ ফেরত দিতে বাধ্য হয়। পরোপকার করতে গিয়ে এক সাধারণ নারীর এই লড়াই শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারের মুখ দেখলেও, এই ঘটনা সমাজকে এক গভীর ভাবনায় ফেলে দিয়েছে।