মহাষষ্ঠীর দিনই ক্যাম্পাসে গরু কেটে ভোজের ডাক! পুজোতেই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি বাংলাদেশে

দুর্গাপুজোর মহাষষ্ঠীর দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে গরু কেটে ভোজের আয়োজনকে কেন্দ্র করে দেখা দিয়েছে তীব্র অসন্তোষ ও সামাজিক বিতর্ক। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চ এবং কেন্দ্রীয় মন্দিরের কাছাকাছি জায়গায় গরুর মাংস রান্নার আয়োজন এবং পরবর্তীতে মহাষষ্ঠীর দিন ক্যাম্পাসে গরু জবাই করার ঘোষণার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মকানুন, ধর্মীয় ভাবাবেগ এবং পড়ুয়াদের অধিকারের প্রশ্নে এক সংঘাতের আবহ তৈরি হয়েছে।

বিতর্কের সূত্রপাত কোথায়? গত ১২ অক্টোবর, সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের পড়ুয়ারা মুক্তমঞ্চের কাছে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার উদ্যোগ নেন। স্থানটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরের খুব কাছে হওয়ায় স্থানীয় হিন্দু পড়ুয়ারা তীব্র আপত্তি জানান। তাঁদের দাবি, মন্দিরের এত কাছাকাছি স্থানে এই ধরনের আয়োজন তাঁদের ধর্মীয় ভাবাবেগকে ক্ষুণ্ন করে। দুই পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হলে সহকারী প্রক্টর ও অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম খান হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি সামাল দেন এবং রান্নার স্থান পরিবর্তন করানো হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নীতি পরিবর্তন ও বিভ্রান্তি: ঘটনার জল গড়ালে ১৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে ক্যাম্পাসে পশু জবাই নিষিদ্ধ করার অনুরোধ জানায়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ২০১১ সালের ‘পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইন’ অনুযায়ী নির্দিষ্ট কসাইখানার বাইরে পশু জবাই আইনত দণ্ডনীয়।

তবে কট্টরপন্থী ও ক্ষুব্ধ পড়ুয়াদের চাপের মুখে পড়ে একই দিনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের অবস্থান বদলে দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তি জারি করে। প্রক্টরিয়াল বোর্ডের মধ্যস্থতায় সমস্যা সমাধানের কথা জানিয়ে নতুন বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ক্যাম্পাসে উৎসব বা অনুষ্ঠান করার অধিকার পড়ুয়াদের রয়েছে এবং পশু জবাই সংক্রান্ত আয়োজনও তার অন্তর্ভুক্ত।

মহাষষ্ঠীর দিন ভোজের সিদ্ধান্ত ও উত্তেজনা: কর্তৃপক্ষের প্রথম বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদে এবং নিজেদের সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়িয়ে একদল পড়ুয়া ১৬ অক্টোবর, অর্থাৎ দুর্গাপুজোর মহাষষ্ঠীর দিনই ক্যাম্পাসে গরু কেটে ভোজের আয়োজন করার ঘোষণা দেন। এবার স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয় কলা ভবনের পাশের একটি খোলা মাঠ।

ইতিমধ্যেই অনুষ্ঠানের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করে একটি গরু কেনা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের কট্টরপন্থী ছাত্র সংগঠন ‘বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র মজলিস’-এর পক্ষ থেকেও আরও একটি গরু উপহার দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। ৭০ টাকার বিনিময়ে নাম নথিভুক্ত করে এই ভোজে অংশ নেওয়ার জন্য সামাজিক মাধ্যমে প্রচার চালানো হয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক এবং প্রক্টরিয়াল বোর্ড জানিয়েছে, অনুষ্ঠান যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো বিতর্কের জন্ম না দেয়, সে বিষয়ে আয়োজকদের সঙ্গে কথা হয়েছে। অন্যদিকে, হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি জয় সাহা জানিয়েছেন, মন্দিরের ঠিক সামনে বা মন্দিরের স্বাভাবিক কাজকর্মে বিঘ্ন না ঘটিয়ে অন্য কোথাও অনুষ্ঠান হলে তাঁদের কোনো লিখিত আপত্তি নেই।

উৎসবের মরসুমে যেকোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উসকানি বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সমস্ত পড়ুয়াকে পারস্পরিক ধর্মীয় ভাবাবেগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছে।