মহাকাশ গবেষণায় যুগান্তকারী সাফল্য! ৩৬ হাজার কিলোমিটার ওপর থেকে দেশের সুরক্ষায় পাহারাদারি চালাবে কোন ঐতিহাসিক স্যাটেলাইট?

ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে যুক্ত হলো আরও এক স্বর্ণালী অধ্যায়। শুক্রবার ভোরে অত্যন্ত সফলভাবে নিজের নির্ধারিত কক্ষপথে পৌঁছে গেল ভারতের প্রথম জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথে কাজ করার উপযোগী সর্বাধুনিক ইমেজিং স্যাটেলাইট ‘EOS-05’। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা তথা ইসরো (ISRO)-র নির্ভরযোগ্য জিএসএলভি-এফ১৭ (GSLV-F17) রকেটের পিঠে ভর করে মহাকাশে পাড়ি দিয়েছে এই ঐতিহাসিক উপগ্রহটি। শুক্রবার ভোর exactly ২টা ৫৫ মিনিটে অন্ধপ্রদেশের শ্রীহরিকোটাস্থ সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টারের দ্বিতীয় লঞ্চ প্যাড থেকে এই সফল উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হয়। ৫১.৭ মিটার উচ্চতা এবং ৪২০.৫ টন ওজনের তিন-ধাপ বিশিষ্ট এই শক্তিশালী রকেটটি প্রায় ২,৩৬৭ কেজি ওজনের ইমেজিং স্যাটেলাইট EOS-05-কে নির্ভুলভাবে তার নির্দিষ্ট সাব-জিওসিঙ্ক্রোনাস ট্রান্সফার অরবিটে সফলভাবে স্থাপন করেছে।

ইসরোর অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী, এটি ছিল জিএসএলভি (GSLV)-র ইতিহাসের ১৯তম উৎক্ষেপণ মিশন এবং শ্রীহরিকোটা থেকে চালিত সামগ্রিক বিচারে ১০৭তম মহাকাশ অভিযান। EOS-05 স্যাটেলাইটটিকে প্রায় ১৭১ কিলোমিটার পেরিজি, ৩১,০২৬ কিলোমিটার অ্যাপোজি এবং ১৯.২৮ ডিগ্রি ইনক্লিনেশনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট জিওসিঙ্ক্রোনাস ট্রান্সফার অরবিটে স্থাপন করা হয়েছে। এরপর উপগ্রহটির নিজস্ব অন-বোর্ড থ্রাস্টার ব্যবহার করে একাধিক নিখুঁত ধাপে এটিকে চূড়ান্ত এবং কাঙ্ক্ষিত কক্ষপথে স্থাপন করা হবে। সফল উৎক্ষেপণের পর ইসরো চেয়ারম্যান ভি নারায়ণন গণমাধ্যমকে জানান যে, রকেটটি অত্যন্ত নিখুঁত ও সফলভাবে উপগ্রহটিকে তার নির্দিষ্ট ট্র্যাকে পৌঁছে দিয়েছে। বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রথম জিএসএলভি উৎক্ষেপণের সময় যেখানে মাত্র ১,৫৩৬ কেজি ওজনের পেলোড বহন করা হয়েছিল, সেখানে এই মিশনে রকেটটি তার সুদীর্ঘ ইতিহাসের সবচেয়ে ভারী অর্থাৎ প্রায় ২,৩৬৭ কেজি ওজনের পেলোড সফলভাবে বহন করে এক নতুন রেকর্ড গড়েছে। রকেটের কাঠামোগত ওজন সুকৌশলে হ্রাস করা এবং উন্নত প্রপালশন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের মাধ্যমেই ধীরে ধীরে এই অসাধারণ সক্ষমতা অর্জন করেছে ইসরো।

EOS-05 হলো মূলত জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথ থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করার জন্য ভারতের প্রথম বিশেষভাবে নির্মিত অত্যন্ত শক্তিশালী ইমেজিং স্যাটেলাইট। এই স্যাটেলাইট থেকে দেশের নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও রিয়েল-টাইম তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে। ইসরোর পরবর্তী পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি অর্থবর্ষের মধ্যেই আরও ছ’টি গুরুত্বপূর্ণ উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে নেভিগেশন স্যাটেলাইট NVS-03 এবং ভারতের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মানবহীন গগনযান মিশন। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ভারতের কক্ষপথে মোট ২১টি আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট সক্রিয় রয়েছে, যার অধিকাংশই লো-আর্থ অরবিট কিংবা সান-সিঙ্ক্রোনাস পোলার অরবিটের অন্তর্ভুক্ত। তবে বর্তমান জিওস্টেশনারি কক্ষপথ পর্যবেক্ষণে ইনস্যাট সিরিজের আবহাওয়া উপগ্রহগুলি কাজ করলেও, EOS-05-এর কার্যক্ষমতা সম্পূর্ণ আলাদা ও অনন্য।

এই নতুন উপগ্রহটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এটি প্রায় ৩৬,০০০ কিলোমিটার উচ্চতায় জিওসিঙ্ক্রোনাস কক্ষপথ থেকে কাজ করবে। ফলে পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্য রেখে এটি নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের উপর প্রায় স্থির অবস্থানে থেকে একটানা নজরদারি চালাতে পারবে। সাধারণ লো-আর্থ অরবিট স্যাটেলাইটগুলি পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার সময় নির্দিষ্ট এলাকার উপর দিয়ে ক্ষণিকের জন্য যাতায়াত করে, ফলে ছবি তুলতে দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু জিওস্টেশনারি কক্ষপথে থাকায় EOS-05 ঝঞ্ঝা, বজ্রপাত, হূলস্থূল আবহাওয়া কিংবা দাবানলের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক ঘটনাগুলি একটানা নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হবে। এছাড়া এতে থাকা দুটি অত্যাধুনিক মাল্টিস্পেকট্রাল ইমেজার ক্যামেরার প্রতি পিক্সেলে ৪২ মিটার স্পেশিয়াল রেজোলিউশন রয়েছে, যা জিওস্টেশনারি কক্ষপথের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ রেজোলিউশন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উল্লেখ্য, এই EOS-05 স্যাটেলাইটটি ‘Gisat-1A’ নামেও পরিচিত, যা ২০২১ সালের ১২ আগস্ট GSLV-F10 রকেটের ক্রায়োজেনিক আপার স্টেজে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক ‘Gisat-1’-এর স্থান সফলভাবে পূরণ করবে। দীর্ঘ আট মাস পর এই মহা-অভিযানের মাধ্যমে ফের মহাশূন্যে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করল ইসরো।