মসজিদে চুমু খাওয়ায় বাংলাদেশের যুবক-যুবতীকে মৃত্যুর সাজা? ঘটনায় তোলপাড় বিশ্ব

সৌদি আরবের মক্কার পবিত্র মসজিদের অভ্যন্তরে তথাকথিত ‘অনৈতিক কাজ’ করার গুরুতর অভিযোগে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক স্তরে তীব্র বিতর্ক ও তোলপাড় শুরু হয়েছে। গত ১৪ অক্টোবর সৌদি প্রশাসনের তরফে এই চরম সাজা কার্যকর করা হলেও মৃত্যুদণ্ডের কারণ, বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং অপরাধের সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ না করায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে মারাত্মক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্র অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশি নাগরিক হলেন চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির এবং সিতি আখতার। ২০২২ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে পাড়ি দেওয়া নজরুল মক্কার ঐতিহ্যবাহী মসজিদ আল-হারামে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তবে কাজে যোগদানের মাত্র আট মাসের মাথায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। অভিযোগ করা হয়, তিনি ও সিতি আখতার মসজিদের ভেতর অনৈতিক কাজে লিপ্ত ছিলেন। তবে কিসের ভিত্তিতে এই অনৈতিকতার বিচার হলো, সে বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ কোনো স্পষ্ট উত্তর দেয়নি। সামাজিক মাধ্যমে একাধিক বিভ্রান্তিকর দাবি উঠলেও, নজরুলের পরিবার এটিকে সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছে। নজরুলের পরিজনের মতে, এক পাকিস্তানি সহকর্মীর সঙ্গে তাঁর বিবাদ হয়েছিল এবং সেই শত্রুতাবশতই তাঁকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়ে থাকতে পারে।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বিতর্কিত দিকটি হলো বাংলাদেশ সরকারের সম্পূণ অন্ধকারে থাকা। বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি প্রশাসন পূর্বে ঢাকাকে কিছুই জানায়নি। এমনকি ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী যে ধরনের কনসুলার সহায়তা ও তথ্য আদানপ্রদান বাধ্যতামূলক, তাও মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। জেড্ডার বাংলাদেশ কনস্যুলেটে পাঠানো বন্দিদের তালিকায় ব্যভিচার ও আইসিটি সংক্রান্ত অপরাধের উল্লেখ থাকলেও মৃত্যুদণ্ডের কোনো আগাম আভাস ছিল না। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকার সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ জাফর এইচ বিন আবিয়াহর কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চেয়ে ‘ডিপ্লোম্যাটিক নোট’ পাঠিয়েছে।
অন্যদিকে, মৃতদের দেহ দেশে ফেরানো নিয়েও চরম জটিলতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সৌদি আরব ও বাংলাদেশের মধ্যে সরাসরি বিমান পরিষেবা সাময়িক ব্যাহত থাকায় প্রক্রিয়াটি থমকে রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনজীবী এবং মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিচারপ্রক্রিয়া বিশ্বজনীন আইনি কাঠামোর চরম ব্যর্থতা। কোনো প্রকার স্পষ্ট প্রমাণ কিংবা প্রকাশ্যে স্বচ্ছ শুনানি ছাড়াই যেভাবে দুই ব্যক্তির জীবন কেড়ে নেওয়া হলো, তা নিয়ে গোটা বিশ্বমঞ্চে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।