মধ্যযুগের অলৌকিক জ্ঞানভাণ্ডার! ৪টি তালা দিয়ে সুরক্ষিত যেখানে ইসলামের অমূল্য সব প্রাচীন পাণ্ডুলিপি

উত্তর আফ্রিকার মুসলিমপ্রধান দেশ মরক্কোর প্রাচীন ও পাহাড়ঘেরা শহর ‘ফেজ’-এর সরু ও আঁকাবাঁকা গলিতে ইঞ্জিনচালিত গাড়ি চলাচলের উপায় নেই। তাই যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের একমাত্র ভরসা গাধা ও গরুর গাড়ি। তবে এই প্রাচীন শহরের কেন্দ্রের দিকে তাকালেই চোখে পড়ে সবুজ সিরামিক টালির চমৎকার ছাদ। এর নিচেই গত সাড়ে এগারোশ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে আসছে ঐতিহাসিক ‘ইউনিভার্সিটি অব আল কারাউইয়্যিন’ বা আল কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয়। ইউনেস্কো ও গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস একে বর্তমান বিশ্বের ‘প্রাচীনতম সচল বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইতালির বোলোনিয়া বা ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড-ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারও শত শত বছর আগে ৮৫৯ সালে এই জ্ঞানপীঠ গড়ে উঠেছিল।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, প্রাচীনতম এই বিশ্ববিদ্যালয়টি কোনো রাজা বা শাসক নয়, বরং একজন মুসলিম নারী ফাতিমা আল-ফিহরি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইতিহাসবিদ ইবনে আবি জারের ‘রাওয আল-কিরতাস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, তিউনিসিয়ার কাইরুয়ান শহরে জন্ম নেওয়া ফাতিমা পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়িক কারণে মরক্কোর ফেজ শহরে এসে বসবাস শুরু করেন। স্বামী, বাবা ও ভাইকে পরপর হারিয়ে উত্তরাধিকারসূত্রে বিশাল সম্পত্তির মালিক হন ফাতিমা ও তার বোন মারিয়াম আল-ফিহরি। দুই বোন সিদ্ধান্ত নেন, এই সম্পদ বিলাসিতায় না উড়িয়ে মানবকল্যাণে ব্যয় করবেন। মারিয়াম নির্মাণ করেন বিশাল ‘আল আন্দালুস মসজিদ’। অন্যদিকে, ফাতিমা তার ভাগের অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন এক অনন্য মসজিদ ও ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র কমপ্লেক্স, যা তার জন্মস্থানের নামানুসারে ‘আল কারাউইয়্যিন’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ইতিহাসবিদদের মতে, ফাতিমা নিজে রোজা রেখে একটানা এই কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ তদারকি করেছিলেন।
শুরুর দিকে শুধু ইসলামী শিক্ষা দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তীতে এখানে ভাষাবিজ্ঞান, ব্যাকরণ, আইন, গণিত, দর্শন, সুফিবাদ, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও এখানে পৃথক স্থানে জ্ঞানার্জন করার সুযোগ পেতেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এটিই বিশ্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি বা সনদ প্রদানকারী উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পোপ দ্বিতীয় সিলভাস্টার, ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন এবং বিখ্যাত বিচারপতি ইবনে আল-আরাবীর মতো বিশ্বখ্যাত মনীষীরা এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র বা শিক্ষক ছিলেন। ১৯৬৩ সালে মরক্কো সরকার এটিকে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে রয়েছে একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রাচীন গ্রন্থাগার। ১৩৫৯ সালে সম্প্রসারিত এই লাইব্রেরিতে মধ্যযুগের ২০ হাজারের বেশি দুর্লভ হাতে লেখা বই ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে রয়েছে ইমাম মালিকের ‘আল-মুওয়াত্তা’, ইবনে ইসহাকের নবীর জীবনী এবং ইবনে খালদুনের ‘মুকাদ্দিমাহ’-র মূল পাণ্ডুলিপি। গ্রন্থাগারের ষোড়শ শতাব্দীর একটি বিশেষ ভল্টে দুর্ভেদ্য তামার দরজায় চারটি তালা রয়েছে, যা খুলতে চারজন চাবিধারীর প্রয়োজন হয়। হাজার বছর পেরিয়ে আল কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয় আজও তার ঐতিহ্য ও গৌরবের দীপ্তি ছড়িয়ে যাচ্ছে।