ভোটার, আধার, প্যান কার্ড থাকলেও মিলল না মুক্তি! ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক ব্যক্তির নাগরিকত্বের আর্জি খারিজ হাইকোর্টের

ভোটার কার্ড রয়েছে, আধার কার্ড রয়েছে, প্যান কার্ড, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, এমনকি পূর্বপুরুষের জমির নথিও রয়েছে— কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও সেই সমস্ত নথি ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক ৪৬ বছরের এক ব্যক্তিকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আর্জি সম্পূর্ণ খারিজ করে দিল কলকাতা হাইকোর্ট। আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, নিজের দাবির পক্ষে কোনও বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ আদালতে হাজির করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন মামলাকারী।

মামলাটি শুনানি হয় বিচারপতি দেবাংশু বসাক এবং বিচারপতি অজয় কুমার গুপ্তর ডিভিশন বেঞ্চে। আবেদনকারী সুমন মোল্লার মূল দাবি ছিল, ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক ওই ব্যক্তি তাঁর কাকা এবং তিনি জন্মসূত্রের নিরিখেই একজন ভারতীয় নাগরিক। কিন্তু সমস্ত সরকারি নথি ও দুই পক্ষের সওয়াল-জবাব খতিয়ে দেখার পর আদালত সেই দাবি খারিজ করে দেয়।

মামলাকারীর আইনজীবী আদালতে সওয়াল করেন যে, ওই ব্যক্তির নামে বৈধ ভোটার পরিচয়পত্র, আধার, প্যান কার্ড এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের দাদুর নামে থাকা প্রাচীন জমির নথিও আদালতে পেশ করা হয়। কিন্তু আদালত সাফ জানিয়ে দেয়, বর্তমান সময়ে এই সমস্ত পরিচয়পত্র নাগরিকত্বের চূড়ান্ত ও অকাট্য প্রমাণ হতে পারে না। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR)-এর সময় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে এবং তাঁর নাগরিকত্বের বৈধতার প্রশ্নটি এখনও ট্রাইবুনালে বিচারাধীন রয়েছে।

শুনানি চলাকালীন আদালত বারবার আবেদনকারীকে আটক ব্যক্তির বাবা-মায়ের পরিচয়, তাঁরা ঠিক কোথায় বসবাস করতেন এবং তাঁদের মৃত্যুর পর কোথায় সমাধিস্থ করা হয়েছে— সেই সংক্রান্ত নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার নির্দেশ দেয়। আদালতের মতে, এই তথ্যগুলি নাগরিকত্বের দাবির সত্যতা যাচাই করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত।

গত ৯ জুলাই এবং ১৫ জুলাই— দু’দফায় এই সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হলেও আবেদনকারী কোনও নির্দিষ্ট ও সন্তোষজনক তথ্য দিতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে আদালতের বিশেষ নির্দেশে আইনজীবীরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সরাসরি আটক ব্যক্তির সঙ্গেও কথা বলেন। তিনি দাবি করেন যে তাঁর বাবা-মা ভারতেই থাকতেন এবং তাঁদের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তাঁরা সুনির্দিষ্টভাবে কোথায় থাকতেন বা তাঁদের কবর কোথায় রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি একেবারেই কিছু জানাতে পারেননি। এমনকি আদালত প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করে কবরের সঠিক অবস্থান জানতে চাইলেও কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য মেলেনি।

অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের আইনজীবী আদালতে বিস্ফোরক তথ্য পেশ করে জানান যে, গত ১৮ জুন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দিষ্ট নির্দেশের ভিত্তিতেই বিদেশি সন্দেহে ওই ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি নিজেই নিজেকে বাংলাদেশের নাগরিক বলে মৌখিক স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন এবং সেই বক্তব্যের অডিয়ো-ভিডিয়ো রেকর্ডও তদন্তকারী সংস্থার কাছে সুরক্ষিত রয়েছে বলে দাবি করা হয়। বিদেশি আইন অনুযায়ী তাঁকে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য আইনসম্মতভাবে ৬০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সেই সময়ের মধ্যেও তিনি প্রয়োজনীয় ও অকাট্য প্রমাণ দাখিল করতে ব্যর্থ হন।

মামলাকারীর আইনজীবীর প্রধান যুক্তি ছিল যে, ট্রাইবুনালে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত মামলার আইনি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে বিদেশি হিসেবে গণ্য করা আইনগতভাবে উচিত নয়। তবে সেই যুক্তিতে কোনও সায় দেয়নি কলকাতা হাইকোর্ট।

সব পক্ষের বক্তব্য, যুক্তি ও সমস্ত নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখে ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, আবেদনকারী এবং আটক ব্যক্তি— কেউই তাঁদের দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিতে পারেননি। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার যে তাঁকে বাংলাদেশি সন্দেহে ডিটেনশন ক্যাম্পে রেখেছে, সেই আইনি পদক্ষেপে এই মুহূর্তে আদালত কোনওরকম হস্তক্ষেপ করবে না।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতা হাইকোর্টের এই তাৎপর্যপূর্ণ রায় ফের একবার অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে দিল যে, ভোটার কার্ড, আধার বা প্যান কার্ডের মতো সাধারণ পরিচয়পত্র থাকলেই নাগরিকত্বের আইনি লড়াইয়ে তা চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয় না। নাগরিকত্ব নিয়ে কোনওরকম বিতর্ক দেখা দিলে আদালত পারিবারিক সূত্র, সঠিক বংশপরিচয়, এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্যের সামগ্রিক মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।