‘ভুল বুঝতে পেরেছি, ক্ষমা চাইছি…’ প্রধানমন্ত্রীর কটূক্তি কাণ্ডে কান্নায় ভেঙে পড়ল ১৫ বছরের কিশোরী, জানুন

দিল্লির যন্তর মন্তরে গত ২৩ জুলাই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) উদ্যোগে আয়োজিত নিট প্রশ্নফাঁস-বিরোধী বিক্ষোভে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়া এক ১৫ বছরের কিশোরী অবশেষে শুক্রবার প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছে। তার ক্ষমা চাওয়ার একটি ভিডিও ইতোমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে। ওই ভিডিয়োতে কিশোরী নিজেকে ১৫ বছরের বলে দাবি করে জানিয়েছে যে, বন্ধুদের সঙ্গে কনট প্লেসে ঘোরার সময় সে ওই বিক্ষোভে সামিল হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর প্ররোচনায় পড়ে সেও প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে অবমাননাকর মন্তব্য করে ফেলে।
ভাইরাল হওয়া ভিডিয়োতে ওই কিশোরীকে কাঁদতে কাঁদতে বলতে শোনা যায়, “আমার বয়স মাত্র ১৫ বছর। আমি না বুঝে যা করেছি, তা সম্পূর্ণ ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এটিই আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ ভুল। ভবিষ্যতে আমি আর কখনও এ ধরনের মন্তব্য করব না কিংবা কোনও আপত্তিকর পোস্ট শেয়ার করব না। আমি হাত জোড় করে গোটা দেশের কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আমি অত্যন্ত লজ্জিত, দয়া করে দেশবাসী ও সকলে আমাকে ক্ষমা করে দিন।” তার এই স্বীকারোক্তি ও অনুতপ্ত হওয়ার দৃশ্য এখন নেটদুনিয়ায় চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
কিশোরীর এই ক্ষমা চাওয়ার ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসে ঠিক তার কয়েক ঘণ্টা আগে, যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই তাঁর ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে একটি বিশেষ ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছিলেন। সেই বার্তায় প্রধানমন্ত্রী জানান যে, যন্তর মন্তরের ওই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটি দেশ তথা বিশ্বের মানুষ দেখেছেন। কিছু বিভ্রান্ত যুবক ও কিশোর যে ধরনের ভাষা ব্যবহার করেছে, তা কোনো সভ্য সমাজেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তারা শুধু তাঁকেই নয়, তাঁর প্রয়াত মাকেও কটূক্তি করেছে। তবে কঠোর আইনি ব্যবস্থা বা শাস্তির দাবি না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী সম্পূর্ণ উদারতা দেখিয়ে বলেন যে, ছোটবেলা ও যৌবনে ভুল হওয়া খুবই স্বাভাবিক এবং সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ প্রত্যেক তরুণ-তরুণীর থাকা উচিত। তিনি পরিষ্কার জানান যে, তিনি ওই যুবকদের সম্পূর্ণ ক্ষমা করে দিতে চান এবং সমাজকেও আহ্বান জানান যাতে তারা পথভ্রান্ত তরুণদের সঠিক পথ প্রদর্শন করে। তাঁর মতে, আদালতের মামলা বা পরিবারের ওপর আইনি হয়রানি চালিয়ে এই সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়।
এদিকে, আইনি দিক থেকে ঘটনাটি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। গত ২৩ জুলাইয়ের ওই বিক্ষোভে আপত্তিকর স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে গত ২৯ জুলাই নয়ডার এক্সপ্রেসওয়ে থানায় কিশোরী ও আয়োজকদের বিরুদ্ধে একটি জিরো এফআইআর দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে এই মামলাটি দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় স্থানান্তরিত করা হয়, যেখানে বর্তমানে পুলিশের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত চলছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদাধিকারীকে উদ্দেশ্য করে এ ধরনের কুরুচিকর মন্তব্যের মাধ্যমে পদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার পাশাপাশি জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছিল। এর ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩৫২, ৩৫৩(১) এবং ৩৫৬(১) ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। প্রতিবেশীদের সূত্রে জানা গেছে, কিশোরী তার মায়ের সঙ্গে নয়ডার একটি অভিজাত আবাসনে বসবাস করত। তবে ঘটনার পর থেকে আবাসনের সেই ফ্ল্যাটটি তালাবদ্ধ রয়েছে এবং তাদের আর দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, এই গোটা ঘটনায় এক অদ্ভুত রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। বিক্ষোভের মূল আয়োজক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি-র পক্ষ থেকে কিশোরীর বিরুদ্ধে পুলিশি এফআইআর দায়ের করার তীব্র বিরোধিতা করা হয়েছে। দলের মুখপাত্র সৌরভ দাস গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান যে, কোনো ধরনের আপত্তিকর বা অবমাননাকর ভাষা কখনোই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না, তবে এ ধরনের মতপ্রকাশের বা প্রতিবাদের জেরে সরাসরি ফৌজদারি মামলা রুজু করা হলে তা দেশের সংবিধানপ্রদত্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এক বিরাট নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাঁর মতে, কেউ ক্ষুব্ধ বা সংক্ষুব্ধ হলে তার জন্য ফৌজদারি মামলা করার বদলে মানহানির আইনি পথ বেছে নেওয়া উচিত ছিল। সবমিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর মহৎ ক্ষমা প্রদর্শনের পর এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি এখন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে।