ভারত বিরোধী মির্জা ফখরুলকেই রাষ্ট্রপতি করছে বাংলাদেশ সরকার! নির্বাচন ঘিরে জল্পনা তুঙ্গে

বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন জমা দিলেন দেশের রাজনৈতিক মহলের পরিচিত মুখ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগির। শাসকদল বিএনপির পক্ষ থেকে তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ২০ অগাস্ট এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের এই নির্বাচনে জয় কার্যত নিশ্চিত বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর প্রকাশ্য ভারত-বিরোধী অবস্থান এবং চিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার প্রসঙ্গ সামনে আসায়, তাঁর এই শীর্ষ পদে আসীন হওয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও শুরু হয়েছে জোর চর্চা।

বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তথা বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকেই মির্জা ফখরুলের নাম রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়। বৈঠকের পর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভি সংবাদমাধ্যমকে জানান, দলের পক্ষ থেকে তাঁরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগির রাষ্ট্রপতি পদে দলের প্রার্থী হয়েছেন। মনোনয়ন পাওয়ার পরপরই ৭৮ বছর বয়সি মির্জা ফখরুল দলের মহাসচিবের পদ এবং বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন।

অন্যদিকে, এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (LDP)। এলডিপির চেয়ারম্যান তথা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ওলি আহমেদ ইতিমধ্যেই নিজের মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে সংসদের সমীকরণ অনুযায়ী বিএনপির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ফখরুলের জয়ের পথেই কোনও বড় বাধা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।

চলতি বছরের গত ২৪ জুলাই ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক কারণে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মহম্মদ সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় দু’বছর আগেই রাষ্ট্রপতির পদটি শূন্য হয়। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা বাধ্যতামূলক। সেই নিয়ম মেনেই এই নির্বাচন হচ্ছে। বর্তমানে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। বাংলাদেশের নিয়মানুযায়ী রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না, বরং দেশের সংসদ সদস্যরাই তাঁকে নির্বাচন করেন। সেই হিসেবে সংসদের বর্তমান সংখ্যাতত্ত্ব ফখরুলের পক্ষেই রয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগির অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। অর্থনীতিতে পড়াশোনা করা ফখরুল ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ২০১১ সাল থেকে তিনি দলীয় স্তরে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন এবং ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিবের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। দলের দুর্দিনে, বিশেষ করে নেত্রী খালেদা জিয়া জেলে থাকার সময় এবং তারেক রহমান দেশের বাইরে অবস্থান করার সময় দলের হাল ধরে রেখেছিলেন তিনি। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর তাঁকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিএনপি চেয়ারপারসনের এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক, তবুও সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির হাতে বেশ কিছু বিশেষ ক্ষমতা থাকে। তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ করেন এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে নির্বাচন কমিশন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত নতুন সংশোধনীগুলির পর রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাছাড়া, বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইস্তাহারে সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার সঙ্গেও এই নামকরণের যোগ থাকতে পারে।

সবথেকে বড় বিষয় হলো মির্জা ফখরুলের ভারত বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান। অতীতে বিরোধী বা সরকারি আসনে থাকার সময় তিনি একাধিকবার ভারতের বিরুদ্ধে একতরফা নীতি বা দাদাগিরির অভিযোগ তুলেছেন। জলবণ্টন চুক্তি সহ বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে নয়াদিল্লির কঠোর সমালোচনা করেছেন তিনি। পাশাপাশি, অতীতে তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যেই দাবি করেছেন যে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও উন্নয়নে চিনের মতো শক্তিশালী বন্ধু রাষ্ট্রের সান্নিধ্য প্রয়োজন। ফলে এমন একজন নেতার হাতে বাংলাদেশের সাংবিধানিক প্রধানের দায়িত্ব যাওয়া আগামী দিনে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার প্রধান বিষয়।