ভারতের বাজারে বিরাট বিনিয়োগ পেপসিকোর! ৫,৭০০ কোটির মেগা প্ল্যানে দেশের কোথায় কী তৈরি হচ্ছে?

ভারতের ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজারের পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করতে এবং নিজেদের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যকে আরও শক্তিশালী করতে এক বিশাল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে আন্তর্জাতিক খাদ্য ও পানীয় প্রস্তুতকারক সংস্থা পেপসিকো ইন্ডিয়া। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সংস্থাটি আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৫,৭০০ কোটি টাকা বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করার এক সুদূরপ্রসারী রোডম্যাপ তৈরি করেছে। এই মেগা বিনিয়োগ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই গত বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে আসামের নলবাড়িতে পেপসিকোর পঞ্চম উৎপাদন কেন্দ্রের চোখধাঁধানো উদ্বোধন করা হলো। শুধুমাত্র এই একক প্ল্যান্টটি নির্মাণ করতেই প্রায় ৭৭৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। পেপসিকোর এই সম্প্রসারণ নীতি কেবল উত্তর বা পূর্ব ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর আগে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনে একটি অত্যাধুনিক কনসেনট্রেট প্ল্যান্ট চালু করা হয়েছিল। এবার দক্ষিণ ভারতে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি তৈরি করতে তামিলনাড়ুর তিরুচিরাপল্লিতেও একটি নতুন প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।
আঞ্চলিক রুচির ওপর বিশেষ জোর
ঐতিহ্যগতভাবে দেশজুড়ে একই ধরনের পণ্য বিক্রির পুরনো কৌশল থেকে সরে এসে পেপসিকো এখন সম্পূর্ণ নতুন পথে হাঁটছে। সংস্থাটি ভারতের বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস এবং আঞ্চলিক রুচিকে কাজে লাগানোর অভিনব পরিকল্পনা নিয়েছে। পেপসিকো ইন্ডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জাগ্রুৎ কোটেচা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এখন থেকে প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব স্বাদ ও পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে পণ্য বাজারে আনা হবে। এই উদ্দেশ্যে ভারতকে প্রায় সাত থেকে নয়টি ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি অঞ্চলের বিশেষ রুচি অনুযায়ী পণ্য তৈরি ও সরবরাহ করা হবে। সংস্থার মূলমন্ত্র অত্যন্ত স্পষ্ট—’ভারতে তৈরি, ভারতের জন্য তৈরি, ভারতীয়দের দ্বারা তৈরি’। পেপসিকোর প্রাথমিক ও প্রধান মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে বিশাল দেশীয় বাজারের ওপর নিবদ্ধ রয়েছে, তবে এর পাশাপাশি ভুটান এবং শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশী দেশগুলিতে সীমিত পরিসরে রপ্তানিও অব্যাহত রাখা হবে।
কৃষক ও কর্মসংস্থানে বিরাট সুযোগ
আসামের নতুন এই উৎপাদন কেন্দ্রটি ওই অঞ্চলের অর্থনৈতিক কাঠামো ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক বিপ্লব ঘটাতে চলেছে। প্রায় ৪৪.২ একর জমির ওপর বিস্তৃত এই বিশাল প্ল্যান্টটিতে সরাসরি অন্তত ৭০০ জন বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি, এটি স্থানীয় অতক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এমএসএমই (MSME) খাতকেও বিপুলভাবে উৎসাহিত করবে। তবে এই মেগা প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবেন স্থানীয় কৃষকরা। চিপস ও স্ন্যাক্স উৎপাদনের জন্য পেপসিকোর নির্দিষ্ট মানের বিশেষ জাতের আলুর প্রচুর প্রয়োজন হয়। এর ফলে আগামী বছরগুলিতে ভারতের ৫,িখিত হাজারেরও বেশি কৃষক সরাসরি আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। এই বিশাল উৎপাদনের চাহিদা মেটাতে প্রায় ৬০,০০০ টন ধারণক্ষমতার নতুন কোল্ড স্টোরেজ বা হিমঘর তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে, যা সামগ্রিক গ্রামীণ কৃষি বাস্তুতন্ত্রকে আরও বহুগুণ শক্তিশালী করে তুলবে।
শীর্ষ ১০ বাজারের লক্ষ্যমাত্রা
বর্তমানে বিশ্বের প্রধান বাজারগুলির মধ্যে ভারত পেপসিকোর শীর্ষ ১৩টি দেশের তালিকায় দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়ের মাথাপিছু ব্যবহার এখনও উন্নত বিশ্বের তুলনায় বেশ কম। পেপসিকো এই ব্যবধানটিকেই তাদের ব্যবসার সম্প্রসারণের জন্য এক সোনালী সুযোগ হিসেবে দেখছে। বিগত ২০২৫ সালের আর্থিক পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, পেপসিকো ইন্ডিয়ার মোট টার্নওভার ছিল ৯,৭৮৯ কোটি টাকা এবং তাদের প্রধান বোটলিং অংশীদার বরুণ বেভারেজেস-এর বার্ষিক রাজস্ব ছিল ১৫,০৭০.৭ কোটি টাকা। এই শক্তপোক্ত অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানই ভারতে কোম্পানির গভীর শেকড় ও স্থায়িত্ব প্রমাণ করে। এখন এই ৫,৭০০ কোটি টাকার মেগা বিনিয়োগের হাত ধরে পেপসিকো বিশ্বব্যাপী তাদের শীর্ষ ১০টি প্রধান বাজারের তালিকায় নিজেদের অবস্থান আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে।