ভয়াবহ আকার নিচ্ছে এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা! কলকাতাসহ বড় শহরগুলিতে কড়া সতর্কতা জারি, চিকিৎসকদের কী পরামর্শ?

জাতীয় রাজধানী দিল্লিতে ফের আশঙ্কাজনকভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সোয়াইন ফ্লু বা এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রকোপ। ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (এনসিডিসি)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ আগস্ট পর্যন্ত দিল্লিতে মোট ১,৭৭৭ জন এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আট গুণেরও বেশি। শুধু রাজধানী দিল্লিই নয়, এর পাশাপাশি কলকাতা ও বেঙ্গালুরুর মতো দেশের অন্যান্য মেগাসিটিগুলোতেও এই ভাইরাসের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে যে, এটি নতুন কোনো মিউটেটেড স্ট্রেন নয়। তাই অযথা আতঙ্কিত না হয়ে প্রতিটি নাগরিককে অবিলম্বে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সোয়াইন ফ্লুর এই হঠাৎ বিস্ফোরণ সাধারণ মানুষের মনে পুরনো কোভিডের দিনগুলির আতঙ্ক ফিরিয়ে এনেছে। এর ফলে আবারও একটি পরিচিত প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে—কোভিড-১৯ এবং এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জার মধ্যে মূল পার্থক্য কীভাবে বোঝা সম্ভব? চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং কোভিড-১৯ উভয়ই শ্বাসযন্ত্রের অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাল রোগ। দুটি ক্ষেত্রেই জ্বর, তীব্র কাশি, গলা ব্যথা, অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং শরীর ব্যথার মতো সাধারণ লক্ষণ প্রকাশ পায়। তবে চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা বলছে, এইচ১এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জার আক্রমণ সাধারণত অত্যন্ত হঠাৎ এবং তীব্র হয়। এতে রোগীরা হঠাৎ করেই প্রচণ্ড জ্বর, তীব্র কাঁপুনি এবং পেশিতে অসহ্য ব্যথার শিকার হন। অন্যদিকে, কোভিডের ক্ষেত্রে উপসর্গের পরিধি আরও কিছুটা দীর্ঘ হতে পারে, যার মধ্যে স্বাদ বা গন্ধ হারিয়ে যাওয়া কিংবা পেটে গণ্ডগোলের মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তবে শুধুমাত্র বাহ্যিক উপসর্গের ওপর ভিত্তি করে এই দুই রোগকে চিকিৎসাগতভাবে পৃথক করা সম্পূর্ণ সম্ভব নয়।
মূলত এইচ১এন১ ভাইরাসের কারণেই সোয়াইন ফ্লু ছড়ায়, যা ২০০৯ সালের বৈশ্বিক মহামারির সময় থেকেই চিকিৎসকদের কাছে পরিচিত। বিপরীতপক্ষে, কোভিড-১৯ ছড়ায় সার্স-কোভ-২ নামের করোনা ভাইরাসের মাধ্যমে। এই দুই ভাইরাসের প্রকৃতি সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ায় একটির চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ অন্যটিতে কোনো কাজ করে না। ইনফ্লুয়েঞ্জার চিকিৎসায় সাধারণত ওসেলটামিভির-এর মতো শক্তিশালী অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, রোগের প্রথম লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই চিকিৎসা শুরু করলে রোগীর দ্রুত সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। অন্যদিকে, কোভিডের চিকিৎসা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আক্রান্ত রোগীর শারীরিক অবস্থার জটিলতার ওপর।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, সাধারণ সর্দিকাশি পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার খেলেই প্রাকৃতিকভাবে সেরে যায়। তবে যদি রোগীর মধ্যে শ্বাসকষ্ট, বুকে তীব্র ব্যথা বা চাপ অনুভূত হওয়া, মানসিক বিভ্রান্তি কিংবা রক্তের অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার মতো গুরুতর লক্ষণ দেখা দেয়, তবে বিন্দুমাত্র দেরি না করে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক।
পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য প্রশাসন যৌথভাবে ময়দানে নেমেছে। ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ মোকাবিলা করতে দিল্লির স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই হাসপাতাল এবং মিউনিসিপাল স্বাস্থ্য আধিকারিকদের নিয়ে একটি জরুরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি, সমস্ত জেলা নজরদারি আধিকারিক, চিফ ডিস্ট্রিক্ট মেডিক্যাল অফিসার এবং হাসপাতালগুলিকে কঠোর নির্দেশিকা মেনে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা পরিকাঠামো জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত শুক্রবার কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জে পি নাড্ডার সভাপতিত্বে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দিল্লির স্বাস্থ্যমন্ত্রী পঙ্কজ কুমার সিং উপস্থিত ছিলেন। সেই বৈঠকে সোয়াইন ফ্লু-এর সংক্রমণ প্রতিরোধে লাগাতার সতর্কতা বজায় রাখা, নজরদারি বাড়াতে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়।