বেহাল দশা সরকারি স্কুলের, পড়ুয়া টানছে মালতি মুর্মুর ‘বিনা পয়সার’ স্কুল! ‘অর্ধ সত্য’ বলে ভাইরাল মালতি!

এক কিলোমিটারের ব্যবধানে দু’টি বিদ্যালয়। একটি সরকারি, অথচ যার পরতে পরতে অবহেলার ছাপ, আর অন্যটি এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে চলা, যেখানে পড়ুয়াদের ভিড় উপচে পড়ছে। এই বৈপরীত্যের ছবি উঠে এল পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি ব্লকের জিলিংসেরেঙ প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং পাশেই মালতিবালা বিদ্যালয়ের (মালতি মুর্মুর অবৈতনিক স্কুল) ক্ষেত্রে। একদিকে সরকারি স্কুলের বেহাল দশা, অন্যদিকে ‘অর্ধ সত্য’ বিতর্কে ভাইরাল মালতি মুর্মু।

সরকারি জিলিংসেরেঙ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র রীতিমতো উদ্বেগজনক। ক্লাসরুমের ছাদ থেকে চাঙড় খসে পড়ছে, সেখান থেকে চুইয়ে পড়ছে বৃষ্টির জল, যা ডেস্কে এবং মেঝেতে জমছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় আলো-পাখা থাকলেও সবই অচল, ক্লাসরুম থাকে অন্ধকারে। মিড ডে মিলের চাল স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, আর সেই চালই যাচ্ছে রান্নার হাঁড়িতে। স্কুলের সীমানা প্রাচীর ভাঙা, সদর দরজাও নেই। ফলে স্কুলের চৌহদ্দিতে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে সাপ। শৌচাগার থাকলেও জলের ব্যবস্থা নেই, এমনকি সৌরচালিত পানীয় জলের প্রকল্পটিও বুজে গেছে। এই চরম অবহেলিত পরিবেশে চলছে স্কুল।

ফলস্বরূপ, এই সরকারি বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ক্রমশ কমছে। অনেক পড়ুয়াই স্কুলছুট হয়ে এক কিলোমিটার দূরে মালতিবালা বিদ্যালয়ে পাঠ নিচ্ছে। সোমবার, সপ্তাহের প্রথম দিন সকাল এগারোটা পাঁচ মিনিটে স্কুলের তালা খুললেন শিক্ষকরা, কিন্তু হাজিরার খাতায় মাত্র ১১ জন ছাত্রছাত্রী। দ্বিতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির যে শ্রেণিকক্ষে ক্লাস হয়, সেখানে মাত্র দু’জন পড়ুয়াকে দেখা গেল। দুই পার্শ্বশিক্ষকের মধ্যে একজন ছিলেন অনুপস্থিত। এই প্রতিকূল পরিবেশে স্কুলের প্রধান শিক্ষক অনাদিকুমার টুডুকেই দুই তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রকে পড়াতে দেখা গেল। এই সরকারি বিদ্যালয়ে মোট ৪৩ জন ছাত্রছাত্রী নথিভুক্ত থাকলেও, গড় হাজিরা ২৫ থেকে ৩০-এর বেশি হয় না। প্রধান শিক্ষক স্বীকার করেছেন যে, ৮-৯ জন পড়ুয়া স্কুলছুট হয়ে মালতির স্কুলেই লেখাপড়া করছে। তিনি জানান, “ওই বেসরকারি স্কুলে ব্যাগ দেওয়া হচ্ছে, ড্রেস দেওয়া হচ্ছে। তাই এখানে আর আসছে না পড়ুয়ারা। তবে বর্ষার মরসুমে এখন উপস্থিতি কম। অন্যান্য দিন ২৫ থেকে ৩০ জন পড়ুয়া আসে। স্কুলের সমস্যার কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। কিন্তু এই পাহাড়ি গ্রামে যা প্রতিবন্ধকতা তাতে সময় মতো কিছু করা যায় না।”

অন্যদিকে, সমাজমাধ্যমে এখন ট্রেন্ডিং মালতি মুর্মু এবং তাঁর ‘বিনা পয়সার’ স্কুল, যেখানে পড়ুয়ার সংখ্যা ৪৫ জন এবং গড় হাজিরা ৩৫ থেকে ৪০। কিন্তু মালতি এবং তাঁর স্বামী বাঙ্কা মুর্মুকে ঘিরে সাম্প্রতিককালে একটি বিতর্ক দানা বেঁধেছে। একটি বেসরকারি সংস্থার তরফে তাঁদের স্কুলকে মাসিক অনুদান এবং মালতিকে সাম্মানিক দেওয়ার বিষয়টিকে তারা ‘অর্ধ সত্য’ বলে ভাইরাল হয়েছেন। প্রথমে তাঁরা কোনও সাহায্য না পাওয়ার দাবি করলেও, পরে বাঙ্কা মুর্মু ভুল স্বীকার করে জানান যে, কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করা তাঁদের ভুল হয়েছে। তিনি গ্রামবাসী ও সকলের সাহায্য নিয়ে স্কুলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান।

মালতির স্বামী বাঙ্কা মুর্মু বলেন, “কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করা আমার ভুল হয়েছে। আমি চাই আমার গ্রামবাসী-সহ সকলের সাহায্য নিয়ে এই স্কুলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। আমার সঙ্গে কারও কোনও শত্রুতা নেই। আমি ও আমার স্ত্রী একটা ভালো কাজ করতে চেয়েছি। সকলের শুভেচ্ছায় যেন সেটা করতে পারি। স্কুল চালানোর জন্য পুলিশের কাছ থেকেও সাহায্য পাই।” তিনি আরও বলেন, “স্কুলের জন্য যা সাহায্য করা হত তা যথেষ্ট ছিল না। তবুও আমরা চালিয়ে নিতাম।” অন্যদিকে মালতি মুর্মু জানান, “আমি জানতাম না যে মাসে মাসে কোনও সাম্মানিক দেওয়া হয়। লকডাউনের বেশ কিছুটা পরে আমার শরীর খারাপ হয়েছিল। আমার মাথায় সমস্যা ছিল তাই হয়তো আমার স্বামী স্কুল সংক্রান্ত কোনো কিছু বিষয় আমাকে বলেনি। আমি চলতি বছর থেকে আবার পড়াতে শুরু করেছি। আমি যাতে স্কুলকে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারি এটাই আমি চাই।”

যে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মালতির স্কুলকে সাহায্য করছে, তাদের অন্যতম কর্মকর্তা শোভন মুখোপাধ্যায় বলেন, “আমরা ওই স্কুলের মাটির দেওয়ালের জন্য ১২ হাজার টাকার বেশি দিয়েছি। ড্রেস দেওয়া হয়েছে। মিড ডে মিলের জন্য প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে দেওয়া হত। এছাড়া আরও অন্যান্য খরচ আমরা দিতাম। মাসে মাসে বাঙ্কাকে আড়াই হাজার করে সাম্মানিক দেওয়া হত শিক্ষকতার কাজের জন্য। যিনি মিড ডে মিল রান্না করতেন সেই রাঁধুনিকেও সাম্মানিক দিতাম।” তিনি আরও যোগ করেন, “তার ৬০০ টাকার সাম্মানিক আমরা বাড়িয়ে ৭০০ করতাম। ২৫০০ টাকাটা বাড়িয়ে হয় ৩ হাজার বা সাড়ে ৩ হাজার করারও চিন্তাভাবনা করছিলাম।” শোভন মুখোপাধ্যায়ের আক্ষেপ, “আমরা কোনওদিন ওই স্কুলে মালতিকে পড়াতে দেখিনি। আমরা জানতামই না যে বাঙ্কার স্ত্রী মালতি। আমরা যে সাহায্য করেছি তার কৃতজ্ঞতাটুকু স্বীকার করা উচিত ছিল। আমাদের নাম না নেওয়া হোক। সাহায্য যে তারা পান সেটা অন্তত বলা উচিত। মিথ্যা বলে শিক্ষা হয় না। তবে মালতিদির পাঠদানকে আমরা কুর্নিশ জানাই।”

২০২০ সাল থেকেই মালতির এই স্কুল শুরু হয়। সেই সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া সংস্থা আর পরে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। তারপর একাধিক সংস্থা তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। তারপরেই ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শোভনবাবুদের সংস্থা মালতির স্কুলের পাশে দাঁড়ায়। ‘অর্ধ সত্য’ বলে ভাইরাল হওয়া মালতি ও তাঁর স্বামীকে ঘিরে নানান বিতর্ক তৈরি হলেও, এখনও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা নানান জিনিসপত্র ও শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ করছে পড়ুয়াদের। সোমবার সেই ছবিও দেখা গেল।