বিহারে ‘সন্দেহজনক’ ভোটার সমীক্ষা! অনুপ্রবেশকারী না নাগরিক যাচাইয়ের প্রথম ধাপ?

বিহারে বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে চলছে বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সমীক্ষা (Special Intensive Revision – SIR), যা রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে যেখানে বিরোধীরা ক্ষোভে ফুঁসছে, সেখানে শাসকদল বিজেপি এটিকে ‘বিদেশি বা অনুপ্রবেশকারীদের সাফাই অভিযান’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। দেশের একাংশে এই পদক্ষেপকে ভবিষ্যতের নাগরিকত্ব যাচাই অভিযানের সূচনা বলে মনে করা হচ্ছে, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই জনমানসে নানা প্রশ্ন দানা বেঁধেছে।
কী এই স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR)?
নির্বাচন কমিশন নির্দিষ্ট সময় অন্তর এই ধরনের নিবিড় সমীক্ষা পরিচালনা করে থাকে। এর আগে ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে দেশজুড়ে এই সমীক্ষা হয়েছিল, এবং বিহারে শেষবার এটি হয়েছিল ২০০৩ সালে। SIR-এর মূল উদ্দেশ্য হলো ভোটার তালিকা থেকে ভুয়া, মৃত অথবা স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে একটি নির্ভুল ও সংশোধিত তালিকা তৈরি করা। এই ঝাড়াইবাছাই প্রক্রিয়ার পরই নতুন ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়।
বিহারের দ্রুত সমীক্ষা ঘিরে বিতর্ক কেন?
ভারতে এর আগেও ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, তবে তা সাধারণত ধীরগতিতে করা হয়। কিন্তু বিহারে আসন্ন নির্বাচনের ঠিক আগে নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই কাজ শুরু করেছে, যা বিরোধীদের সমালোচনার মূল কারণ। তাদের অভিযোগ, এই তড়িঘড়ি পদক্ষেপের ফলে বহু প্রকৃত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই বিহারের তালিকা থেকে প্রায় ৫৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে বলে জানা গেছে, যদিও কমিশনের তরফে ১লা আগস্ট চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে।
প্রয়োজনীয় নথি: ১১টি কঠোর শর্ত
বিহারের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ভোটারদের কাছে ১১টি নির্দিষ্ট নথি চেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে অন্যান্য রাজ্যে SIR শুরু হলে একই ধরনের নথিপত্র চাওয়া হতে পারে। এই ১১টি গুরুত্বপূর্ণ নথি হলো:
১. কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের বর্তমান বা অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের পরিচয়পত্র।
২. সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে ১৯৮৭ সালের ১লা জুলাইয়ের আগের কোনো সরকারি নথি (যেমন ব্যাঙ্ক, পোস্ট অফিস বা LIC নথি)।
৩. জন্ম শংসাপত্র।
৪. পাসপোর্ট।
৫. সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থায়ী বসবাসকারীর শংসাপত্র।
৬. যেকোনো বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সংক্রান্ত শংসাপত্র যেখানে জন্ম তারিখ উল্লেখ আছে।
৭. তফসিলি জাতি, উপজাতি বা অনগ্রসর শ্রেণিভুক্ত হলে তার শংসাপত্র।
৮. জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (NRC) তালিকায় নাম।
৯. রাজ্য সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের তৈরি করা পারিবারিক রেজিস্ট্রার।
১০. বনাঞ্চলের অধিকারের শংসাপত্র।
১১. সরকার প্রদত্ত জমি বা বাড়ির নথি (যেমন দলিল, পর্চা ইত্যাদি)।
আধার, EPIC বা রেশন কার্ড কেন অযোগ্য?
SIR প্রক্রিয়া নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। গত ১০ই জুলাই সুপ্রিম কোর্ট কমিশনকে আধার, এপিক (ভোটার কার্ড) বা রেশন কার্ডকেও নথি হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছিল। তবে নির্বাচন কমিশন সেই পরামর্শ খারিজ করে জানিয়েছে যে, ভোটার তালিকার জন্য এই নথিগুলি গ্রহণযোগ্য নয়। কমিশনের মতে, আধার কার্ড শুধুমাত্র একটি পরিচয়পত্র, নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। একইভাবে, ভোটার কার্ড এবং রেশন কার্ডকেও নাগরিকত্বের পর্যাপ্ত প্রমাণ হিসেবে মানতে রাজি নয় কমিশন।
কাদের নথি জমা দিতে হবে?
বিহারের প্রেক্ষাপাপটে, ২০০৩ সালের ভোটার তালিকায় যাদের নাম ছিল, তাদের নাম বাতিল হবে না। কিন্তু এরপর গত ২২ বছরে যাদের নাম ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়েছে, তাদেরই প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে। যদি এই রাজ্যেও SIR শুরু হয়, তবে ২০০২ সালকেই ভিত্তি বছর হিসেবে ধরা হবে এবং পরবর্তীতে যাদের নাম ভোটার তালিকায় উঠেছে, তাদেরই নতুন করে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে। এই প্রক্রিয়া একদিকে যেমন স্বচ্ছতা আনতে পারে, তেমনই বহু পুরোনো বা দুর্বল নথিপত্রের কারণে অনেককে তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কায় ফেলেছে।