বিশ্বজুড়ে চিনির আকাল! ইথানল নীতির মারপ্যাঁচে কি আর মিষ্টিমুখ করতে পারবে আমজনতা?

ক্রমবর্ধমান চিনির দাম বর্তমানে বিশ্বজুড়ে রান্নাঘরের বাজেট ও সাধারণ মানুষের পকেটে বড় ধরনের টান ধরাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির জোগান এবং মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তৈরি হওয়া এই সংকট এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও সরকারের তরফ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে যে অভ্যন্তরীণ বাজারে চিনির দাম বাড়ার পেছনে ইথানল উৎপাদনের কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই, তবুও বিশ্বব্যাপী সরবরাহের ঘাটতি এবং লাগাতার দাম বৃদ্ধির বাস্তব চিত্র অন্য কথা বলছে। বিশ্বের প্রধান চিনি রফতানিকারক দেশগুলোও এখন ক্রমবর্ধমান সংকটের মুখে পড়ে আমদানির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বহুমুখী কারণ সক্রিয় রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হলো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, উৎসবের মরশুমের ঠিক আগে হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া চাহিদা, প্রতিকূল আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে আখের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি, বিশ্বজুড়ে সামগ্রিক চিনির জোগান ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীদের দ্বারা মজুতদারি ও ফটকাবাজি। চলতি মরশুমে চিনির উৎপাদন আনুমানিক ৩০৬ লক্ষ মেট্রিক টন (এলএমটি) হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা আখ উৎপাদনকারী রাজ্যগুলোর প্রাথমিক অনুমান ৩৪৩ এলএমটি-র তুলনায় অনেকটাই কম। বিশেষ করে রেড রট এবং টপ বোরার নামক ক্ষতিকারক রোগের আক্রমণ এবং অতিরিক্ত বৃষ্টির জেরে আখের ফসলের উৎপাদন মার খেয়েছে। যদিও সরকার পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, অক্টোবরে নতুন মাড়াই মরশুম শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ চিনির মজুত সুরক্ষিত রয়েছে।

এই সংকটের প্রভাব শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বিশ্বজুড়ে চিনির সংকট এক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশ্বের বৃহত্তম আখ উৎপাদনকারী দেশ ব্রাজিল, যা একাই বিশ্ব বাজারের ২৪ শতাংশ উৎপাদন করে, বর্তমানে চরম চিনির ঘাটতির মুখোমুখি হয়েছে। ব্রাজিলের জাতীয় সরবরাহকারী সংস্থা কোনাবের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে চিনি উৎপাদন প্রায় ৩ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার ফলে চলতি বছরে প্রায় ৪৩ মিলিয়ন টন কম চিনি উৎপাদিত হতে পারে। এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ব্রাজিলের বর্তমান ইথানল নীতি এবং বিশ্বজুড়ে সক্রিয় এল নিনোর নেতিবাচক প্রভাব। অপরিশোধিত তেলের চড়া দামের কারণে ব্রাজিলের মতো প্রধান উৎপাদক দেশগুলো আখ থেকে চিনি তৈরির বদলে সেটিকে ইথানল উৎপাদনে ব্যবহার করতে শুরু করেছে। জুলাই মাসের শেষে ব্রাজিল তাদের বাধ্যতামূলক ইথানল মিশ্রণের হার বাড়িয়ে ৩২ শতাংশে উন্নীত করেছে, যা আগের তুলনায় অনেক বেশি।

অন্যদিকে, আবহাওয়ার বৈরী আচরণ এবং তীব্র এল নিনোর প্রভাবে ভারত, থাইল্যান্ড এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর আখ চাষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন পণ্যের বাজারে চিনির ফিউচার মূল্য প্রতি পাউন্ডে ১৭ সেন্টের উপরে লেনদেন হচ্ছে, যা সাম্প্রতিককালের অন্যতম সর্বোচ্চ স্তর। গবেষক ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আখ এবং সুগার বিটের চাষের হার ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাওয়ার কারণে আগামী ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ মরশুমে বিশ্বব্যাপী চিনির এই ঘাটতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। ইথানল নীতির আগ্রাসী বিস্তার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বিমুখী চাপে বিশ্বজুড়ে চিনির এই লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতি অদূর ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে বলেই মনে করা হচ্ছে।