টাকা দিলেই মিলত পরিচয়পত্র! ভোটার, প্যান থেকে বার্থ সার্টিফিকেট—সব জালিয়াতি এক ছাদের তলায়

রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বেআইনি কার্যকলাপ ও সাইবার অপরাধের জাল কতটা বিস্তার লাভ করেছে, তার আরও এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এল। খাস কলকাতার উপকণ্ঠে টিটাগড় স্টেশন চত্বরের কাছে দীর্ঘদিন ধরে রমরমিয়ে চলছিল একটি বেআইনি নথিপত্র তৈরির চক্র। নগদ টাকার বিনিময়ে সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছিল ভয়োগ বা জাল সরকারি পরিচয়পত্র। গোপন সূত্রে প্রাপ্ত খবরের ভিত্তিতে এবং একটি সাইবার প্রতারণা মামলার দীর্ঘ তদন্ত চালিয়ে অবশেষে এই বিশাল জালিয়াতি চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। অভিযান চালিয়ে আমডাঙা থানার পুলিশ এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে এবং সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে অত্যাধুনিক সমস্ত ডিজিটাল সরঞ্জাম।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, টিটাগড় স্টেশনের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জনবহুল এলাকার একটি গোপন আস্তানা থেকে এই বেআইনি কারবারটি চালানো হচ্ছিল। তদন্তকারী আধিকারিকদের প্রাথমিক অনুমান, এই চক্রটি নিছক ছোটখাটো কোনো অপরাধ নয়, বরং এর নেপথ্যে একটি সুসংগঠিত ও বড়সড় গ্যাং বা চক্র কাজ করছে। টাকার অঙ্কের বিনিময়ে এখানে খুব সহজেই তৈরি করে দেওয়া হতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি এবং বেসরকারি নথি। এর মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিচয়পত্র যেমন ভারতের ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটির সঙ্গে জড়িত কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র, প্যান কার্ড এবং বিভিন্ন ধরনের জন্ম শংসাপত্র বা বার্থ সার্টিফিকেট। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ করে ভোটার কার্ড তৈরির ক্ষেত্রে মারাত্মক সব কারচুপি করা হতো, যেখানে একজনের ছবির সাথে অন্য ব্যক্তির নাম বা সম্পূর্ণ আলাদা ঠিকানা জুড়ে দেওয়া হতো, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত হতে পারত।
সাইবার প্রতারণা মামলার তদন্তের সূত্র ধরেই আমডাঙা থানার একটি বিশেষ দল আকস্মিক এই গোপন আস্তানায় হানা দেয়। পুলিশের অতর্কিত এই অভিযানের মুখে পড়ে চক্রের মূল পান্ডারা পালানোর চেষ্টা করলেও শেষরক্ষা হয়নি। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ এক অভিযুক্তকে হাতেনাতে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। তল্লাশি চালিয়ে ওই অবৈধ কারখানা থেকে প্রচুর পরিমাণে সন্দেহজনক নথি এবং উচ্চপ্রযুক্তির ইলেকট্রনিক গ্যাজেট বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে বায়োমেট্রিক যন্ত্র, আঙুলের ছাপ সংগ্রহের ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার, আই স্ক্যানার বা চোখের মণি পরীক্ষার যন্ত্র, একাধিক ডেস্কটপ কম্পিউটার এবং ল্যাপটপ। এই সমস্ত যন্ত্রপাতির সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ভুয়ো কার্ড তৈরি করা হতো বলে প্রাথমিক অনুমান তদন্তকারীদের।
পুলিশ বর্তমানে ধৃত ব্যক্তিকে লাগাতার জেরা করে এই চক্রের বাকি মাথাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই জাল নথিগুলি ঠিক কাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এবং এর পেছনে কোনো বড় কোনো রাষ্ট্রবিরোধী বা আর্থিক অপরাধের সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। খাস স্টেশন চত্বরের পাশে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে এই বেআইনি চক্র মাথাচাড়া দিল, তা নিয়ে স্থানীয় স্তরেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তদন্তকারী আধিকারিকরা আশা করছেন, ধৃতকে জেরা করে আগামী দিনে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে এবং এই জালিয়াতি চক্রের শিকড় কতদূর বিস্তৃত, তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।