বিরিয়ানির আদি উৎস কি ভারত নয়? ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে এল এক অজানা ও চমকপ্রদ সত্য!

বিরিয়ানির নাম শুনলেই বেশিরভাগ মানুষের মুখে জল চলে আসে এবং মন ভালো হয়ে যায়। হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি, লখনউ বিরিয়ানি, কলকাতা বিরিয়ানি এবং মালাবার বিরিয়ানির মতো লোভনীয় সব প্রকারের বিরিয়ানি ভারতের গণ্ডি পেরিয়ে সারা বিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই কারণে স্বাভাবিকভাবেই বেশিরভাগ মানুষের সুদৃঢ় বিশ্বাস যে বিরিয়ানির আসল উৎপত্তি বোধহয় ভারতেই হয়েছিল। তবে, দেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এবং বিশিষ্ট খাদ্য বিশেষজ্ঞদের গবেষণা ও মতামত সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি গল্প বলে। ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, বিরিয়ানির উৎস শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ইতিহাস।

পারস্য থেকে শুরু হয়েছিল পথচলা

বেশিরভাগ ইতিহাসবিদের মতে, এই রাজকীয় খাবারের আসল উৎপত্তি হয়েছিল পারস্যে অর্থাৎ আধুনিক ইরানে। সেকালের রাজকীয় বাবুর্চিরা ঘি বা চর্বিতে চাল হালকা করে ভেজে তাতে মাংস, বাদাম, জাফরান এবং সুগন্ধি মশলা যোগ করে অল্প আঁচে রান্না করার এক অনন্য কৌশল আবিষ্কার করেছিলেন। এই বিশেষ কৌশলটিই বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ‘দম’ রান্নার পদ্ধতি নামে পরিচিত।

পরবর্তীতে পারস্যের রাজদরবারের এই জনপ্রিয় রন্ধনশৈলী ব্যবসায়ী, সৈনিক এবং যাযাবর ভ্রমণকারীদের হাত ধরে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাস বলছে, এই খাবারটি বাণিজ্য পথের মাধ্যমে পারস্য থেকে মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন শহর হয়ে ধীরে ধীরে আফগানিস্তানে এসে পৌঁছায়।

আফগানিস্তান থেকে ভারতে মুঘলদের আগমন

আফগানিস্তানের রন্ধনশৈলীতেও এর একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ইতিহাস রয়েছে। পঞ্চদশ শতাব্দীতে আফগানিস্তানের হেরাত ও কাবুলে চাল ও মাংস দিয়ে তৈরি রাজকীয় খাবার বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেখানকার রাজপরিবারগুলোর বিভিন্ন বিশেষ অনুষ্ঠানে ‘কাবুলি পোলাও’ পরিবেশন করা হতো, যাতে চাল, খাসির মাংস, গাজর, কিশমিশ, বাদাম এবং এলাচ ব্যবহার করা হতো।

পরবর্তীতে ১৫১৫ সালে মুঘল সম্রাট বাবর যখন কাবুলে আসেন, তখন তিনি মধ্য এশিয়া ও পারস্যের এই সুপ্রাচীন খাদ্য ঐতিহ্য নিজের সঙ্গে ভারতে নিয়ে আসেন। এরপর ১৫২৬ সালে ভারতে স্থায়ীভাবে আসার পর তিনি এই খাবারের সাথে ভারতীয় স্থানীয় মশলা এবং সুগন্ধি বাসমতি চালের মিশ্রণ ঘটান। মনে করা হয়, এভাবেই ধীরে ধীরে আজকের আধুনিক ভারতীয় বিরিয়ানির উদ্ভব ঘটেছিল।

দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন সংযোগ এবং বিবর্তন

তবে মুঘলদের আগমন ছাড়াও দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন ইতিহাসেও এই ধরনের পদের হদিশ পাওয়া যায়। কিছু ঐতিহাসিকের মতে, প্রায় দ্বিতীয় শতকে বর্তমান তামিলনাড়ু অঞ্চলে সৈন্যদের পুষ্টি জোগানোর জন্য চাল, ঘি, মাংস, গোলমরিচ এবং তেজপাতা দিয়ে একটি বিশেষ পদ তৈরি করা হতো। যদিও তাকে আজকের আধুনিক বিরিয়ানি বলা যায় না, তবুও অনেক খাদ্য বিশেষজ্ঞ এটিকে বিরিয়ানির অন্যতম প্রাচীন রূপ হিসেবে গণ্য করেন।

এরপর অবধ এবং হায়দ্রাবাদের রাজকীয় রন্ধনশৈলী এই খাবারটিকে এক নতুন ও সুউচ্চ পরিচয় দেয়। লখনউয়ের বিরিয়ানি তার মৃদু মশলা এবং রাজকীয় আভিজাত্যের জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠে, অন্যদিকে হায়দ্রাবাদের বিরিয়ানি তার তীব্র মশলাদার স্বাদ ও জাফরানের সুবাসের জন্য স্বতন্ত্র পরিচিতি লাভ করে। কালক্রমে কলকাতা, মালাবার, আম্বুর এবং সিন্ধি বিরিয়ানির মতো নানা প্রকারভেদ তৈরি হয়। সবমিলিয়ে, বিরিয়ানি হলো বহু সংস্কৃতি এবং বাণিজ্য পথের এক অপূর্ব সম্মিলিত ঐতিহ্য।