বিয়ে থেকে সম্পত্তির অধিকার—সব নিয়মে বড় বদল! রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেতেই মোদী-শাহের রাজ্য ঘিরে উত্তাল রাজনীতি

মহারাষ্ট্রের পর এবার দেশের আরও এক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে বাস্তবায়িত হতে চলেছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি (UCC)। গুজরাটের বহুল আলোচিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল ২০২৬-এ আনুষ্ঠানিকভাবে সিলমোহর দিলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। রাষ্ট্রপতির এই ঐতিহাসিক অনুমোদনের ফলে এবার পশ্চিমের এই রাজ্যে আইনগতভাবে ইউসিসি চালুর পথ পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে গেল। আর এই বড় আইনি পদক্ষেপে একদিকে যেখানে নারী ক্ষমতায়ন ও আইনি সমতা প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছে শাসক দল বিজেপি, অন্যদিকে ঠিক তেমনই এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছে বিরোধী দল কংগ্রেস। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি সই করার পর থেকেই গুজরাটের রাজনৈতিক পারদ এখন চড়মে।

রাষ্ট্রপতির এই সিদ্ধান্তকে ঐতিহাসিক এবং দূরদর্শী বলে স্বাগত জানিয়েছে রাজ্য ও কেন্দ্রের শাসক শিবির। বিজেপি নেতা অনিল প্যাটেল জোরালো সওয়াল করে জানিয়েছেন যে, রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অর্থ হলো এখন থেকে গুজরাটে ইউসিসি আইন পূর্ণমাত্রায় কার্যকর হয়ে গেল। তাঁর মতে, এতদিন ধরে বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, লিভ-ইন সম্পর্ক এবং পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকারের মতো অতি সংবেদনশীল বিষয়গুলি বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য আলাদা আলাদা ব্যক্তিগত আইনের অধীনে পরিচালিত হতো। এর ফলে আইনি ক্ষেত্রে এক ধরণের বৈষম্য তৈরি হয়েছিল। নতুন এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি সেই সমস্ত কাঠামোগত বৈষম্য দূর করে সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য সমান আইনি অধিকার নিশ্চিত করবে। সংবিধান প্রণেতা বাবাবাহেব আম্বেদকরের স্বপ্নের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিজেপি নেতারা দাবি করেছেন যে, বহুদিনের সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য আজ গুজরাটে সফলভাবে বাস্তবায়িত হলো।

তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে ময়দানে নেমেছে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। গুজরাট প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি অমিত চাভদা একহাত নিয়ে রাজ্য সরকারকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকার চরম বেকারত্ব, লাগামছাড়া প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি, আদিবাসীদের জল-জঙ্গল-জমির অধিকার হরণ, দলিত ও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি এবং কৃষকদের আত্মহত্যার মতো জ্বলন্ত ও গুরুতর আর্থ-সামাজিক সমস্যাগুলি থেকে সাধারণ মানুষের নজর ঘোরানোর জন্যই অত্যন্ত সুকৌশলে ইউসিসি-কে সামনে নিয়ে এসেছে। কংগ্রেসের স্পষ্ট দাবি, বিধানসভায় বিলটি পেশ করার আগে রাজ্যের বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত ছিল। বিধানসভার অধিবেশন চলাকালীন কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বিলটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার জন্য সিলেক্ট কমিটিতে পাঠানোর জোর দাবি তোলা হলেও শাসক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তা গ্রাহ্য করেনি। কংগ্রেসের অভিযোগ, এই আইন রাজ্যের আদিবাসী, দলিত, ওবিসি বা সাধারণ মানুষের জীবনের ন্যূনতম উন্নতি ঘটাবে না, বরং এটি স্রেফ রাজনৈতিক স্বার্থে সরকারের ব্যর্থতা ঢাকবার একটি বড় হাতিয়ার।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের মার্চ মাসেই গুজরাট বিধানসভায় এই বিতর্কিত ও তাৎপর্যপূর্ণ ইউসিসি বিল ২০২৬ পাশ হয়েছিল। রাজ্যের সমস্ত সম্প্রদায়ের মহিলাদের সমান আইনি সুরক্ষা এবং সমানাধিকার প্রদানই এই বিলের মূল লক্ষ্য বলে দাবি করা হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানানো হয়েছে যে, এই বিধানে বিবাহ সংক্রান্ত আইন, বিবাহবিচ্ছেদ প্রক্রিয়া, লিভ-ইন সম্পর্কের আইনি স্বীকৃতি, খোরপোষ এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত’ ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই জাতীয় ঐক্য ও প্রশাসনিক একতা বজায় রাখতে এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে রাজ্য সরকার।