বিপ্লবীদের অপমান ‘সন্ত্রাসবাদী’ আখ্যা! বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্র ঘিরে বিতর্ক মেদিনীপুরে

এও সম্ভব! বিপ্লবী শহর মেদিনীপুরে রাতারাতি দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা বিপ্লবীরা হয়ে উঠলেন ‘সন্ত্রাসবাদী’! বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রশ্নপত্রে এহেন লেখা ঘিরে তীব্র বিতর্ক ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে পশ্চিম মেদিনীপুরজুড়ে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে এটিকে ‘টাইপিং মিসটেক’ বলে ঘটনার দায় এড়িয়েছে, কিন্তু এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন ক্ষুব্ধ জনতা ও রাজনৈতিক মহল।
প্রশ্নপত্রের বিতর্কিত অংশ
ঘটনার সূত্রপাত বুধবার, ৯ জুলাই। রাজ্যের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ষষ্ঠ সেমিস্টারের পরীক্ষা ছিল। প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে পরীক্ষার্থীরা স্তম্ভিত হয়ে যান। দেখা যায়, ইতিহাসের একটি প্রশ্নে লেখা রয়েছে, “মেদিনীপুরের তিনজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নাম করো যারা সন্ত্রাসবাদীদের দ্বারা নিহত হন?” এই প্রশ্নটি প্রকাশ্যে আসার পরই শোরগোল পড়ে যায়।
নিন্দার ঝড় ও বিপ্লবী বংশধরদের আক্ষেপ
বিভিন্ন সংগঠন ইতিমধ্যেই এই প্রশ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গাফিলতির অভিযোগ জমা দিয়েছে। শিক্ষানুরাগী ঐক্যমঞ্চ তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, “এই ধরনের ঘটনা লজ্জাজনক, অগ্রহণযোগ্য ও দুরভিসন্ধিমূলক।” মেদিনীপুরের বিপ্লবীদের কেন এভাবে অসম্মান করা হলো এবং ‘সন্ত্রাসবাদী’ আখ্যা দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ওই প্রশ্নপত্র ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে মেদিনীপুরের বিপ্লবীদের বংশধরেরা এই ঘটনায় গভীরভাবে ক্ষুব্ধ।
বিপ্লবী বিমল দাশগুপ্তের ছেলে রণধিত দাশগুপ্ত এই বিষয়ে বলেন, “এটা অত্যন্ত লজ্জাজনক ব্যাপার এবং ধিক্কার জানাই।” একইসাথে তিনি আক্ষেপের সুরে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজকে কটাক্ষ করে বলেন, “যেখানে কিছু না লিখেই শিক্ষকরা নিয়োগ হয়, হাইকোর্টে যাদের মামলা চলে; তাদের (রাজ্য সরকার) কাছ থেকে এর থেকে আর বেশি কিছু আশা করা যায় না। এর আগেও এরা ক্ষুদিরাম বসু, নেতাজিকেও সন্ত্রাসবাদী হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এখন সব মোবাইলে ব্যস্ত। কেউ ইতিহাস পড়ে না, ইতিহাস নিয়ে চর্চাও করে না।”
তিনি আরও বলেন, “বাবা (বিপ্লবী বিমল দাশগুপ্ত) তিন কুখ্যাত ম্যাজিস্ট্রেট মারতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছেন; অথচ দুটো বছরের দুটো দিন ছাড়া আর কোনো দিনই তাঁদেরকে স্মরণ করা হয় না। আগামী প্রজন্ম হয়তো জানবেই না এই জেলার কারা কারা বিপ্লবী ছিলেন।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক চাপানউতোর
যদিও এই নিয়ে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ফোন ধরেননি, তবে রেজিস্ট্রার জয়ন্তকিশোর নন্দী বলেন, “প্রশ্নপত্রে কোনো কারণে টাইপিং মিসটেক হয়ে গিয়েছে। আমরা বিষয়টা নিয়ে খতিয়ে দেখছি। এর সঙ্গে কারা কারা জড়িত এবং কেন এই ঘটনা ঘটল বা ভবিষ্যতে যাতে না ঘটে, তা নিয়ে বৈঠক ডেকেছি।”
অন্যদিকে, এই ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও তীব্র চাপানউতোর শুরু হয়েছে। ডান-বাম-বিজেপি একযোগে এর প্রতিবাদ করেছে। বিজেপির মেদিনীপুর জেলা সহ-সভাপতি শঙ্কর গুছাইত ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুকে ই-মেইল করে প্রশ্নপত্রের বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, “দেশের জন্য যারা লড়াই করেছেন সেই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সন্ত্রাসবাদী বলা হচ্ছে। এর থেকে লজ্জার ঘটনা মেদিনীপুরে আর হতে পারে না। মুখ্যমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর প্ররোচনায় সারা রাজ্যে বারবার এমন ঘটনা ঘটছে। তাই তাঁদেরকে মেইল করে অভিযোগ করেছি। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে। ধিক্কার জানাই এই ঘটনার। তৃণমূলের সহায়তায় এই কাজ করা হয়েছে। ছাত্র সমাজ এই ঘটনায় জড়িত কি না খতিয়ে দেখতে হবে।”
স্থানীয় তৃণমূল নেতা ও কাউন্সিলর সৌরভ বসুও এই প্রশ্নপত্র নিয়ে ধিক্কার জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “বিপ্লবীদের এভাবে অপমানের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।” সিপিএম নেতা কুন্দন গোপের কথায়, “এটা জঘন্যতম অপরাধ। তৃণমূল ও বিজেপি দুই দল মিলেমিশে এই ধরনের কর্মকাণ্ড করে বেড়াচ্ছে। এটা নাগপুর থেকে কন্ট্রোল হয়। ধিক্কার জানানোর ভাষা নেই।”
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইতিহাস বিকৃতি এবং জাতীয় বীরদের প্রতি অসম্মান কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয় এবং বিতর্ক কীভাবে প্রশমিত হয়, এখন সেটাই দেখার।