বাসের চাকা সচল রাখতে যুদ্ধের প্রস্তুতি! পুজোর মরশুমে দূরপাল্লার যাত্রীদের স্বস্তি দিতে বিশাল কর্মী নিয়োগ রাজ্য সরকারের

আসন্ন শারদোৎসবের দিনগুলিতে দূরপাল্লার যাত্রীদের যাতায়াত সম্পূর্ণ সুগম করতে এবং রাজ্যের পরিবহন ব্যবস্থাকে আরও মজবুত করতে একগুচ্ছ যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন নিগম (এনবিএসটিসি)। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা তীব্র কর্মী সংকট মেটাতে এবং ডিপোতে দিনের পর দিন ধুলো জমতে থাকা বাসগুলিকে দ্রুত রাস্তায় নামাতে একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকরী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে সংস্থার পক্ষ থেকে বিপুল পরিমাণ কর্মী নিয়োগের কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
যাত্রী পরিষেবার মান বৃদ্ধি এবং নতুন ও পুরনো বাসের চাপ সফলভাবে সামলাতে নিগমের তরফে এজেন্সির মাধ্যমে ২৪৫ জন চালক এবং ২১৬ জন কন্ডাক্টর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এক বছরের মেয়াদে এই কর্মী নিয়োগ করা হলেও, সন্তোষজনক পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে পরবর্তীতে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হবে। একইসঙ্গে পূর্বতন এজেন্সির অধীনে কর্মরত কর্মী ও সুপারভাইজরদেরও একই শর্তে নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা হবে।
নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের নির্দিষ্ট কিছু যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। আবেদনকারীদের বয়স ২৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে। চালক পদের জন্য আবেদনকারীকে অন্তত অষ্টম শ্রেণি পাস হতে হবে এবং ন্যূনতম পাঁচ বছরের হেভি প্যাসেঞ্জার মোটর ভেহিকেল চালানোর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বৈধ লাইসেন্স থাকতে হবে। অন্যদিকে, কন্ডাক্টর পদের জন্য প্রার্থীদের স্বীকৃত বোর্ড থেকে ন্যূনতম মাধ্যমিক পাস বা সমতুল যোগ্যতা, বাস কন্ডাক্টিংয়ের এক বছরের অভিজ্ঞতা এবং কন্ডাক্টর লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। ড্রাইভার ও কন্ডাক্টর উভয়ের ক্ষেত্রেই বাংলা পড়া ও লেখার পাশাপাশি ইংরেজি ও হিন্দি পড়ার দক্ষতা থাকাও অত্যন্ত জরুরি।
প্রশাসনের অভিযোগ, পূর্ববর্তী সরকারের শাসনকালে নিগমে প্রায় ৭৫ শতাংশ পদ শূন্য হয়ে পড়েছিল। এর ফলে চালক ও কন্ডাক্টরের অভাবে বহু নতুন ও পুরনো বাস বছরের পর বছর ডিপোতেই দাঁড়িয়ে থেকে নষ্ট হয়েছে এবং বন্ধ হয়ে গেছে একাধিক লাভজনক রুট। তবে রাজ্যে পালাবদলের পর এই ঐতিহ্যবাহী পরিবহন সংস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন রুটে ৬০টি নতুন অত্যাধুনিক বাস নামানো হয়েছে এবং চলতি বছরে আরও ১০০টি নতুন বাস যুক্ত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। পুজোর আগেই যাত্রী পরিষেবা স্বাভাবিক করার পাশাপাশি একাধিক নতুন রুট ও পুজো স্পেশাল প্যাকেজ চালু করাই এখন নিগমের প্রধান অগ্রাধিকার।
পরিষেবা সর্বদা সচল রাখতে এবং আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া আনতে নিগমের অর্ডিনারি, এক্সপ্রেস, এসি, ভলভো এবং প্রিমিয়াম স্লিপার পরিষেবার আধুনিকীকরণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের অবশ্যই অটোমেটেড ফেয়ার কালেকশন সিস্টেম এবং ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম পরিচালনায় পারদর্শী হতে হবে। সপ্তাহে সাতদিনই যাত্রী পরিষেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে কর্মীদের রোটেশনাল ছুটি ধার্য করা থাকবে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত বেতনের পাশাপাশি চালকদের জন্য অতিরিক্ত ‘হেভি ডিউটি স্টিয়ারিং অ্যালাউন্স’ এবং ওভারটাইমের জন্য আলাদা সাম্মানিক দেওয়া হবে। পাশাপাশি কর্মী কল্যাণে ইপিএফ ও ইএসআই-র মতো গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাও চালু থাকবে।
রাজ্যের এই নতুন পরিবহন উদ্যোগ এবং দ্রুত কর্মী নিয়োগ প্রসঙ্গে পরিবহন প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মন কড়া সুরে আগের সরকারের সমালোচনা করে জানান যে বিগত সরকারের উদাসীনতা ও অপশাসনের ফলেই এনবিএসটিসি কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়েছিল। তিনি আরও জানান যে পুজোর মরশুমের আগেই সমস্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করে ডিপোতে আটকে থাকা বাসগুলি রাস্তায় নামানো হবে। প্রতিমন্ত্রীর আশ্বাসে পুজোর আগেই রাজ্যের পরিবহন ব্যবস্থায় এক বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছেন সাধারণ যাত্রীরা।