বাংলাদেশি ছাত্রের ভারতীয় নাগরিক সাজার ভয়ঙ্কর জালিয়াতি, মেয়রের ওয়ার্ডেই ঘাঁটি!

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের (NBU) এক বাংলাদেশি ছাত্রের ভারতীয় নাগরিক সেজে অবৈধভাবে বসবাস করার আশঙ্কাই এবার সত্যি হলো। উত্তরবঙ্গ সংবাদের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাংলাদেশি ছাত্র শান ভৌমিকের (Shan Bhowmik) চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির চিত্র। শিলিগুড়ি থানার অদূরে, খোদ মেয়র গৌতম দেবের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাবুপাড়া এলাকায় ‘ভারতীয়’ পরিচয় দিয়ে ফ্ল্যাট কিনে বসবাস করছিল এই তরুণ। শুধু ভোটার ও আধার কার্ড নয়, ইতিমধ্যেই সে প্যান কার্ডও তৈরি করে ফেলেছে। শানের বাবুপাড়ার ফ্ল্যাটটি বর্তমানে তালাবন্ধ অবস্থায় রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বেশ কয়েক বছর আগেই বাংলাদেশি শান্ত, শান ভৌমিক নামে একটি ভারতীয় আধার কার্ড তৈরি করেছে (কার্ড নম্বর: 2842-3683-5257)। এই আধার কার্ড ব্যবহার করে সে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছে, পরিবহন দপ্তরের নথিপত্র তৈরি করেছে এবং ফ্ল্যাট কেনার চুক্তিপত্রও সম্পাদন করেছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে জমা পড়া শানের প্যান কার্ডটিও (কার্ড নম্বর- EQYPB 8300Q) পাওয়া গেছে। এই ঘটনা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার অফিস থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে অবস্থিত একটি আবাসনে বছর চারেক আগেই দু’কামরার ফ্ল্যাট কিনেছিল শান। রবিবার সকালে সংশ্লিষ্ট আবাসনে গিয়ে দেখা যায় শানের প্রথম তলার ফ্ল্যাটটি তালাবন্ধ। পাশের ফ্ল্যাটের আবাসিকরা বাংলাদেশি ছাত্রের এই কুকীর্তি শুনে হতবাক হয়ে গেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বয়স্ক প্রতিবেশী জানান, “ছেলেটি আমাদের বলেছিল ওর বাড়ি নদীয়ার দিকে। আমরা জানতাম ও ফোটোগ্রাফার। তবে কখন আসত, কখন যেত বুঝতাম না। যা শুনছি তা মারাত্মক।” আবাসনের নীচতলার এক বাসিন্দা বলেছেন, “প্রথম যেদিন ওর (শানের) নামে সংবাদ প্রকাশিত হয়, সেদিন থেকেই আর ফ্ল্যাটে আসেনি। কোথায় গিয়েছে কেউ জানে না। ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেরই ফ্ল্যাটে যাতায়াতও ছিল। কীভাবে এতসব করল প্রশাসনের তা তদন্ত করে দেখা দরকার।”
আবাসনের ডেভেলপার সুজাতা দে স্বীকার করেছেন যে, শান যখন ফ্ল্যাটটি কিনেছিল, তখন সে ভারতীয় নথিপত্রই জমা দিয়েছিল। সুজাতা বলেন, “আমাদের কাছে ভারতীয় নথিপত্রই দিয়েছিল। ভোটার, আধার কার্ড সবই ভারতীয়। আমাদের পক্ষে তো সেসব দেখে বোঝার উপায় ছিল না কিছুই।” তিনি আরও জানান যে, বছর চারেক আগেই শান ফ্ল্যাটটি কিনেছিল এবং সেসময় চুক্তিপত্রে কিছু ভুল ছিল। বছর দেড়েক আগে নতুন চুক্তিপত্র হলেও এখনও ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রেশন হয়নি। শান যে বাংলাদেশি তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি? এই প্রশ্নে সুজাতা জানান, “প্রথমে শুনলাম ছেলেটি মাঝেমধ্যেই বাংলাদেশে যেত। পরে শুনেছিলাম ওর বাড়ি বাংলাদেশে। তখন বিষয়টি নিয়ে অতটা ভাবিনি।” বাংলাদেশে বাড়ি জানা সত্ত্বেও কেন পুলিশকে জানাননি, এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর সুজাতার কাছ থেকে মেলেনি।
ছাত্র ভিসা নিয়ে ভারতে এসে একজন বাংলাদেশি তরুণ কীভাবে অবৈধ নথি তৈরি করে বছরের পর বছর ধরে শিলিগুড়ি শহরের প্রাণকেন্দ্রে বসবাস করতে পারলো, তা নিয়ে প্রশাসন বা পুলিশের কর্তারা বিন্দুমাত্র আভাস পেলেন না কেন—এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার এবং মেয়র গৌতম দেব এই ঘটনাকে “খুবই স্পর্শকাতর বিষয়” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে কথা বলব। তদন্ত করে যাতে যথাযথ পদক্ষেপ হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ওয়ার্ড কমিটিকেও দ্রুত খোঁজ নিতে বলব। আমরা চেষ্টা করলেও শহরে কারা আসছেন, কারা থাকছেন তার সব তথ্য পুরনিগমে জমা পড়ছে না। পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে শহরের নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা আরও কিছু পদক্ষেপ করব।” পুলিশের কর্তারা অবশ্য বিষয়টি নিয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের রংপুর ডিভিশনের ঠাকুরগাঁও জেলায় শানের বাড়ি। শিলিগুড়ি থেকে বাংলাদেশের ওই এলাকার দূরত্ব খুব বেশি নয়। প্রশাসনের আধিকারিকদের একাংশের অনুমান, অবৈধভাবে ভারতে বসবাসের জন্যই পরিকল্পনামাফিক ছাত্র ভিসা নিয়ে এদেশে ঢুকেছিল শান। যাতে ছাত্র ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি করা যায়, তারজন্যই মাস কমিউনিকেশনের পর উইমেন স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হয়েছিল সে।
বেআইনিভাবে গেস্ট ফ্যাকাল্টি হওয়ার পাশাপাশি এই বাংলাদেশি তরুণ ভারতে ব্যবসাও শুরু করেছিল। তার ফোটোগ্রাফির ব্যবসা ছিল, যেখানে সে ক্যামেরা ভাড়া দেওয়া এবং চুক্তিতে অনুষ্ঠানের ছবি তোলার কাজ করত। আইন অনুসারে সেটাও অবৈধ। ফোটোগ্রাফার হিসাবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বা বেসরকারি অনুষ্ঠানেও শানকে দেখা গিয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে ভৌগোলিক অবস্থানের নিরিখে শিলিগুড়ি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ভারতীয় নথি তৈরি করে শিলিগুড়িতে ঘাঁটি গাড়ার পেছনে বাংলাদেশি তরুণের অন্য কোনো গোপন উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা নিয়েই এখন গোয়েন্দা মহলে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং এর পেছনের রহস্য উন্মোচন অত্যন্ত জরুরি।
তথ্যসূত্র: উত্তরবঙ্গ সংবাদ