বন্দে মাতরম গাওয়াকেন্দ্রিক তুঙ্গে বিতর্ক! কংগ্রেস-ন্যাশনাল কনফারেন্সের সংঘাত নিয়ে উত্তাল রাজনীতি!

জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দে মাতরম’-এর পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ পরিবেশন করাকে কেন্দ্র করে জম্মু ও কাশ্মীর রাজনীতিতে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। রাজ্যের ক্ষমতাসীন জোটের দুই প্রধান শরিক—কংগ্রেস এবং ন্যাশনাল কনফারেন্সের মধ্যে এই বিষয়ে মতপার্থক্য এখন জনসমক্ষে চলে এসেছে। শ্রীনগরে অনুষ্ঠিত একটি মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা এবং ন্যাশনাল কনফারেন্সের সভাপতি ফারুক আবদুল্লার উপস্থিতিতে যখন জাতীয় গানের সম্পূর্ণ সংস্করণটি পরিবেশিত হয়, ঠিক তখনই এই রাজনৈতিক বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। আর এই অন্তর্দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে খুব দ্রুত আসরে নেমে পড়েছে প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টিও (BJP)।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটিয়ে কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি কড়া বার্তা দেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, দলের ঐতিহাসিক নীতি ও অবস্থান অনুযায়ী ‘বন্দে মাতরম’-এর কেবল নির্দিষ্ট প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়া উচিত। তাঁর জোরালো যুক্তি ছিল, স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বর্ণযুগে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই পটেল, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ, মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মতো দূরদর্শী জাতীয় নেতাদের মতামত এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুচিন্তিত পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়েই কংগ্রেস এই নির্দিষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছিল। তাঁর দাবি, এই স্তোত্রটির সম্পূর্ণ সংস্করণ ভারতের বহুত্ববাদী ও সমন্বয়বাদী ভাবধারার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কংগ্রেসের এই একতরফা বার্তার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তাদেরই জোটসঙ্গী ন্যাশনাল কনফারেন্স। দলের দায়িত্বশীল নেতা বশির আহমেদ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, ইন্ডিয়া জোটের অংশীদার হয়ে কংগ্রেস দল কোনোভাবেই অন্য কোনো শরিক দলকে বলে দিতে পারে না যে তারা কী গান গাইবে বা কতটা গাইবে। কোনো বিশেষ নির্দেশ বা মতাদর্শ মানুষের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে তারা সবসময় অবস্থান নিয়েছেন বলেও স্পষ্ট করে দেন তিনি। এর পাল্টা জবাব দিতে পিছপা হয়নি কংগ্রেসও। দলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাষায় কটাক্ষ করে বলা হয় যে, ওমর আবদুল্লা এবং ফারুক আবদুল্যারা ‘ইন্ডি’ জোটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তাই জোটের শৃঙ্খলার প্রতি তাদের সম্মান জানানো উচিত, আরএসএসের বা নাগপুরের এজেন্ডাকে অনুসরণ করা নয়।

এই শরিকি কোন্দল এবং অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগ হাতছাড়া করেনি গেরুয়া শিবির। বিজেপির প্রবীণ রাজ্যসভা সাংসদ সুধাংশু ত্রিবেদী তীব্র আক্রমণ শানিয়ে মন্তব্য করেছেন যে, পূর্ণাঙ্গ ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার বিরোধিতা করার মধ্য দিয়ে কংগ্রেস আবারও প্রমাণ করে দিল যে দলটি আজকের একবিংশ শতাব্দীতে এসে একপ্রকার ‘মুসলিম লিগ’-এর চরিত্রে পরিণত হয়েছে। কংগ্রেসের এই নীতিকে তিনি চরম বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতা বলেও কটাক্ষ করেছেন। পাশাপাশি, বিজেপির অন্য এক নেতা আর এস পাঠানিয়া প্রশ্ন তুলেছেন যে, যেখানে খোদ উপত্যকার বিচ্ছিন্নপন্থী শক্তিগুলিও জাতীয় গান নিয়ে কোনো রকম আপত্তি প্রকাশ করেনি, সেখানে মূলধারার একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে কংগ্রেসের কেন এই প্রবল আপত্তি থাকল?

উল্লেখ্য, ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে কংগ্রেসের বর্তমান এই আপত্তি বা অবস্থান অবশ্য নতুন কিছু নয়। গত মাসেই কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ১৯৩৭ সালের দলের পুরনো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তই বহাল রাখার কথা স্পষ্টভাবে জানানো হয়। সেই দলিলে বলা হয়েছিল যে, দলীয় অনুষ্ঠানগুলিতে এখন থেকে জাতীয় গানের কেবল প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়া হবে। অন্য দিকে, কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার চলতি বছরেই একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা জারি করে জানিয়েছে যে, সমস্ত সরকারি অনুষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অফিশিয়াল সমারোহে ‘জন গণ মন’-এর ঠিক আগে ‘বন্দে মাতরম’-এর সমস্ত ছয়টি স্তবকই সুরের সঙ্গে পরিবেশন করতে হবে। সবমিলিয়ে, জাতীয় গান ও স্তোত্রের পবিত্রতাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই পুরোনো রাজনৈতিক তরজা এবার সরাসরি জম্মু-কাশ্মীরের জোট রাজনীতির অন্দরেও বিশাল বড় ফাটল ও টানাপড়েন তৈরি করল।