প্যান্ডেলের টঙে ঘুঘু আর বাবুইয়ের ছানা, বিসর্জনের ১০ দিন পরও খোলা গেল না মণ্ডপ!

বিসর্জনের দিন গুণলে ২১ অক্টোবর কেটে গিয়েছে দশ-দশটি দিন। কিন্তু পুজোর দিন পার হলেও মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে চিন্তায় মাথা চুলকোচ্ছেন এগরা বাজারের কাছে অবস্থিত ‘ফ্রেন্ডস ইউনাইটেড ক্লাব’-এর সম্পাদক জয়ন্ত সাহু। কারণ, মণ্ডপ ভাঙতে গিয়েই বাঁশের কারুকাজের মাঝে নজরে এসেছে চারটি জীবন্ত বাবুই পাখির বাসা! শুধু বাসাই নয়, তাতে পরম আদরে ফুটে উঠেছে খুদে ছানা, রয়েছে ডিমও। এই দৃশ্য দেখে প্যান্ডেল না ভেঙে কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। একই অভূতপূর্ব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে চুঁচুড়ার সুকান্তনগরের ‘সুকান্ত স্মৃতি সংঘ’-তেও, যেখানে ঘুঘু পাখির পরিবারের জন্য মণ্ডপ খোলাই আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।

থিমের মণ্ডপেই বাস্তবের ‘বাসা’

এগরা বাজারের ফ্রেন্ডস ইউনাইটেড ক্লাবের এ বছরের পুজোর থিমই ছিল ‘বাবুই পাখির বাসা’। বাঁশ ও কঞ্চি দিয়ে নিখুঁত কারুকাজে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল মণ্ডপটি। কিন্তু কে জানত, সেই কৃত্রিম শিল্পকর্মেই মন মজে যাবে আসল বাবুই পাখির দল! উৎসবের দিনগুলোতে হাজার মানুষের হইচইয়ের মাঝেও গোপনে মণ্ডপের চূড়াতে ডিম পেড়ে জমিয়ে সংসার পেতে বসেছিল তারা। বিসর্জনের পর ডেকোরেটরের কর্মীরা যখন প্যান্ডেল খুলতে শুরু করেন, তখনই প্যান্ডেল মিস্ত্রি সন্তোষ শাসমলের নজরে আসে বিষয়টি।

প্যান্ডেল মিস্ত্রি সন্তোষ বাবু জানান, “বাচ্চাগুলোর এখনও চোখ পর্যন্ত ফোটেনি। ডিমও রয়ে গিয়েছে। ওদের তো আর এভাবে ফেলে দেওয়া যায় না!” খবর ছড়াতেই ক্লাব কর্তারা ছুটে আসেন। তবে তৈরি হয়েছে এক নতুন বিপত্তি। পুজোর মাঠের পাশেই মূল রাস্তা হওয়ায় মণ্ডপ না খোলায় যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। পাশাপাশি, সামনেই কালীপুজো হওয়ায় পরবর্তী মণ্ডপ তৈরির কাজও আটকে গিয়েছে।

পাখিদের বাঁচাতে উদ্যোগ ও বন দফতরের প্রশংসা

সমস্যা মেটাতে মানবিক উদ্যোগ নিয়েছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। বাজার থেকে বড় বড় ঝুড়ি কিনে এনে তার ভেতর নারকেলের ছোবড়া দিয়ে নরম তুলতুলে গদি বানানো হয়েছে। পরিকল্পনা রয়েছে, সাবধানে ডিম ও ছানাসহ বাসাগুলি সেই ঝুড়িতে স্থানান্তর করে পাশের একটি বড় গাছে টাঙিয়ে দেওয়া হবে। তবে তাতে পাখিরা তাদের ছানাদের গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। এই বিষয়ে স্থানীয় বন দফতরকে খবর দেওয়া হলে আধিকারিক অতুল প্রসাদ দে জানান, “অস্থায়ী সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্যান্ডেল না ভেঙে পাখিদের প্রতি এই মমত্ববোধ ও দায়িত্বশীলতার জন্য ক্লাব কর্তৃপক্ষকে বিশেষ ধন্যবাদ।”

একই দৃশ্য চুঁচুড়াতেও!

ঠিক একই রকম মানবিকতার সাক্ষী চুঁচুড়ার সুকান্তনগরের ‘সুকান্ত স্মৃতি সংঘ’। তাঁদের পুজো মণ্ডপের টঙে বাসা বেঁধেছে একটি ঘুঘু পাখি। সেখানে ইতিমাদ্যেই চারটি ডিমের মধ্যে একটি ডিম ফুটে ফুটফুটে ছানা বেরিয়েছে, বাকিগুলো ফোটার অপেক্ষায়। ক্লাব সদস্যরা স্পষ্ট সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সেই খুদে ছানাগুলো স্বাবলম্বী হয়ে ডানা মেলে মুক্ত আকাশে উড়তে শিখছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁরা কিছুতেই মণ্ডপ ভাঙবেন না। প্রকৃতির এই মিষ্টি উপহারকে আগলে এখন শুধুই পাখিদের ডানা শক্ত হওয়ার প্রহর গুনছেন ক্লাব কর্তারা।