‘পৃথিবী এখন গুরুতর অসুস্থ রোগীর মতো!’ বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ে বিজ্ঞানীদের চরম সতর্কবার্তা

পৃথিবী এখন এক ভয়াবহ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, পৃথিবীর উষ্ণতা ক্রমশ সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর অবস্থা এখন চূড়ান্ত উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্যানেলের সদস্যসহ বিশ্বের ৭০ জনেরও বেশি প্রখ্যাত বিজ্ঞানী একটি যৌথ গবেষণাপত্রে জানিয়েছেন, মানবসৃষ্ট তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং সমুদ্রে তাপপ্রবাহের প্রভাবে পৃথিবী এখন এক ‘গুরুতর অসুস্থ রোগী’র মতো আচরণ করছে।

আয়ারল্যান্ডের মেয়নুথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং এই গবেষণার সহ-লেখক পিটার থর্ন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ‘‘আমরা আমাদের জীবনে এই প্রথম দেখছি, পৃথিবীর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাগুলো হয় পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে, অথবা সেগুলো চরম আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।’’ বিশেষ করে আমেরিকা এবং বিভিন্ন উন্নত দেশের পৃথিবী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় আর্থিক বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়ায় বৈশ্বিক উষ্ণতা পর্যবেক্ষণের প্রচেষ্টা এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে।

‘আর্থ সিস্টেম সায়েন্স ডেটা’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের চেয়ে ১.৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এর মধ্যে ১.৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের জন্য দায়ী মানুষের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা ও শিল্প কর্মকাণ্ড। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, বর্তমান গতির পরিবর্তন না হলে ২০৩০ সালের মধ্যেই আমরা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সেই বিপজ্জনক সীমায় পৌঁছে যাব, যা ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে এড়িয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিশ্ব।

গবেষণায় উঠে এসেছে, পৃথিবী অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাপ সঞ্চয় করছে, যার ফলে তৈরি হয়েছে ‘পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্যহীনতা’। অর্থাৎ, পৃথিবী যে পরিমাণ সূর্যের তাপ গ্রহণ করছে, সেই তুলনায় তা মহাশূন্যে বিকিরিত হতে পারছে না। এর ফলে আটকে থাকা তাপ পৃথিবীকে ভেতর থেকে দ্রুত গরম করে তুলছে। ব্রিটেনের লিডস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পিয়ার্স ফরস্টার জানিয়েছেন, ১৯৭০-এর দশক থেকে এই ভারসাম্যহীনতা ক্রমাগত বাড়ছে এবং সাম্প্রতিক দশকগুলোতে তা দ্বিগুণ হয়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।

এই উষ্ণায়নের পেছনে দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রথমত, কল-কারখানা ও যানবাহন থেকে গ্রিনহাউস গ্যাসের রেকর্ড পরিমাণ নিঃসরণ। দ্বিতীয়ত, বায়ুমণ্ডল থেকে অ্যারোসল বা ধূলিকণার মতো দূষণরোধী উপাদানের ঘাটতি। আগে এই ধূলিকণাগুলো সূর্যের আলোকে আয়নার মতো প্রতিফলিত করে পৃথিবীকে শীতল রাখত, কিন্তু এখন দূষণ নিয়ন্ত্রণের ফলে সেই সুরক্ষা কবজ দুর্বল হয়ে পড়েছে। সব মিলিয়ে, কার্বন ডাই-অক্সাইডের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি পৃথিবী নামের এই গ্রহকে এক উত্তপ্ত চুল্লিতে পরিণত করছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এখনই যদি বিশ্বজুড়ে পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার না করা হয়, তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।