পুলিশের সামনেই ধুন্ধুমার! তোলাবাজির ভোজ ঘিরে বিজেপির দুই গোষ্ঠীর রক্তাক্ত সংঘর্ষে উত্তপ্ত আনন্দপুর

খাস কলকাতার বুকে প্রকাশ্য রাজপথে পুলিশকে সাক্ষী রেখে সংঘাতে জড়াল ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) দুই গোষ্ঠী। তোলাবাজির টাকা দিয়ে একটি প্রীতিভোজের আয়োজন করাকে কেন্দ্র করে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। আনন্দপুর এলাকায় ঘটা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে চরম শোরগোল পেকেছে। ঘটনার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশের সামনেই দুই পক্ষের হাতাহাতি ও মারপিট শুরু হয়, যা মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, আনন্দপুর এলাকায় বেশ কিছুদিন ধরেই দলের অন্দরে সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন নতুন ও পুরনো কর্মীদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছে। অভিযোগ উঠেছে, সম্প্রতি ‘নব্য বিজেপি’ বা দলীয় স্তরে নবযোগদানকারী একটি গোষ্ঠীর তরফে স্থানীয় এলাকায় একটি প্রীতিভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। এই ভোজের খরচ এবং এর পেছনে থাকা মূল অর্থের উৎস নিয়েই প্রশ্ন তোলে দলেরই অপর একটি অংশ। এই পক্ষের স্পষ্ট অভিযোগ ছিল যে, এলাকায় বিভিন্ন অনৈতিক উপায়ে তোলাবাজি বা বলপূর্বক আদায় করা টাকা দিয়েই মূলত এই জমকালো প্রীতিভোজের সমস্ত খরচ মেটানো হয়েছে।
এই অভিযোগ তোলার পরেই দুই পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়ায়। প্রীতিভোজ চলাকালীন ১০৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিজেপির মণ্ডল সভাপতি অরুণ বিষয়ীর সরাসরি নেতৃত্বে একটি গোষ্ঠী হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেছে প্রতিপক্ষ শিবির। ভোজসভার আনন্দ মুহূর্তের মধ্যেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা লাঠিসোটা ও ইট নিয়ে একে অপরের ওপর চড়াও হন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে খবর পেয়ে তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে পৌঁছয় আনন্দপুর থানার পুলিশ বাহিনী। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, পুলিশের উপস্থিতি সত্ত্বেও দুই পক্ষের উন্মত্ত কর্মীরা একে অপরের ওপর চড়াও হতে পিছপা হননি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা তো দূরের কথা, খোদ পুলিশের সামনেই দু’পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় হাতাহাতি ও মারপিট চলতে থাকে, যা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান সাধারণ পথচারীরাও।
দিনের বেলার এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই রাতের অন্ধকারে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। অভিযোগ, আনন্দপুর থানায় দুই পক্ষ লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পৌঁছলে থানার চত্বরেই ফের নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায়। গভীর রাতে আনন্দপুর থানার মূল গেটের সামনেই বিজেপির দুই গোষ্ঠীর সমর্থকরা আবারও প্রকাশ্য সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। থানা চত্বরের বাইরে পুলিশি নিরাপত্তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দুই পক্ষ কিল, চড় এবং ঘুষি নিয়ে একে অপরের ওপর চড়াও হয়। মধ্যরাতে চলা এই দ্বিতীয় দফার সংঘর্ষের জেরে আনন্দপুর থানা চত্বর এবং তার আশেপাশের এলাকা রণক্ষেত্রের রূপ নেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করতে হয় এবং বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাসকদলের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা থাকলেও বিরোধী দলীয় শিবিরের এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং থানার সামনে এহেন প্রকাশ্য মারপিটের ঘটনা দলের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক দলগুলির কর্মীরা যদি প্রকাশ্য রাস্তায় এবং থানার সামনে এমন তাণ্ডব চালায়, তবে সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। পুলিশ পুরো ঘটনার একটি স্বতঃপ্রণোদিত তদন্ত শুরু করেছে এবং ভিডিও ফুটেজ খতিয়ে দেখে এই সংঘর্ষে যুক্ত থাকা মূল উসকানিদাতা ও অভিযুক্তদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চলছে। এই ঘটনার পর থেকে পুরো আনন্দপুর এলাকায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে এবং অতিরিক্ত পুলিশি পাহারা বসানো হয়েছে।