পার্কিং লটের তলায় এ কী লুকিয়েছিল! ডাম্পার-ট্রাকের আড়ালে চলত কোন ভয়ংকর কারবার?

বীরভূমের কুখ্যাত পাথর ব্যবসায়ী তথা তথাকথিত ‘পাথর সম্রাট’ মহম্মদ নাজিবুদ্দিন ওরফে টুলু মণ্ডলের অবৈধ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আরও এক বড়সড় আইনি পদক্ষেপ করেছে প্রশাসন। পুলিশ সূত্রে পাওয়া সর্বশেষ এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনুযায়ী, এবার এই প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা আরও সাড়ে বিয়াল্লিশ কোটি টাকা সম্পূর্ণভাবে ফ্রিজ করা হয়েছে। এই নতুন পদক্ষেপের ফলে পুলিশ ও তদন্তকারী আধিকারিকদের হাতে ফ্রিজ হওয়া টুলু মণ্ডলের মোট টাকার পরিমাণ এক লাফে বেড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩৫ কোটি ৫০ লক্ষ টাকায়। এর আগে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ তাঁর কাছ থেকে নগদ ৫৩ লক্ষ টাকা এবং বিপুল পরিমাণ সোনা ও বহুমূল্য সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছিল। সব মিলিয়ে, বীরভূমের এই পাথর ব্যবসায়ীর কাছ থেকে এখনও পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করা মোট সম্পত্তির আর্থিক পরিমাণ এবার আক্ষরিক অর্থেই ডবল সেঞ্চুরির পথে এগোচ্ছে, যা নিয়ে রাজ্যজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও রাজনৈতিক গুঞ্জন শুরু হয়েছে।

তদন্তে নেমে বীরভূমের মহম্মদ বাজারে অবস্থিত টুলু মণ্ডলের এই সুবিশাল পার্কিং লটের অন্দরমহলে হানা দিয়ে পুলিশ আধিকারিকরা এমন কিছু চমকে দেওয়ার মতো কাণ্ডকারখানার হদিস পেয়েছেন, যা দেখে রীতিমতো চোখ কপালে উঠেছে তদন্তকারীদের। সরেজমিন তদন্তে দেখা গিয়েছে, মহম্মদ বাজারের ওই বিশেষ পার্কিং লটের ভেতর সারি সারি সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারী ভারী ডাম্পার ও ড্রাম ট্রাক। শুধু তাই নয়, ওই এলাকার কয়েক বিঘা জমির ওপর পাহাড়প্রমাণ আকারে মজুত করে রাখা হয়েছে বালি এবং কোটি কোটি টাকার স্টোন চিপস। এই বিশাল বাণিজ্যিক পরিকাঠামোয় সাধারণ ট্রাক বা ডাম্পারের পাশাপাশি রয়েছে একাধিক রোড রোলার এবং অন্যান্য ভারী নির্মাণ যন্ত্রপাতি, যা অবৈধ পাথর ও বালি উত্তোলনের সিন্ডিকেটের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

তবে এই পার্কিং লটের সবচেয়ে অন্ধকার দিকটি উন্মোচিত হয়েছে এর অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত বিন্যাস ও গোপন কার্যকলাপে। পুলিশি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গিয়েছে, এই পার্কিং লটের ভেতরেই তৈরি করা হয়েছিল ছোট ছোট সুসজ্জিত কিছু অফিস ঘর। চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে যে, মূলত এই গোপন অফিস কক্ষগুলোর ভেতরেই বিভিন্ন সরকারি দফত্রের নজর এড়িয়ে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ছাপা হতো জাল ডি সি আর (DCR) বা রয়্যালটি রসিদ। এই জাল রসিদ ব্যবহারের মাধ্যমেই বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকার পাথর ও মিনারেল পাচার করা হতো বলে অনুমান করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই পার্কিং লটের অন্দরেই তৈরি করা হয়েছিল টুলু মণ্ডলের একটি বিলাসবহুল ও সুসজ্জিত বেডরুম। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জোর দাবি করা হয়েছে যে, বীরভূমের এই প্রভাবশালী পাথর ব্যবসায়ী সারাদিনের অবৈধ কারবারের তদারকি শেষে এই বিশেষ ঘরের আরামেই দিনের বেশ কয়েক ঘণ্টা সময় কাটাতেন। সাধারণ মানুষের চোখ এড়াতে এবং নিখুঁত অপরাধের জাল বুনতে এই সুরক্ষিত ডেমো রুমটি ব্যবহার করা হতো। ইতিমধ্যে পুলিশ ওই পার্কিং লট চত্বরে থাকা সমস্ত ডাম্পার এবং সন্দেহজনক ভারী যানবাহনগুলি মহম্মদ বাজার থানার পক্ষ থেকে পাকড়াও করে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেয়াপ্ত করেছে। এই ঘটনায় অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।