পশ্চিমী দেশগুলোর স্বীকৃতিতে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন! গাজার রক্তস্রোতের মাঝে কি ফিলিস্তিনের সমস্যার সমাধান হবে?

প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রকে সম্প্রতি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা ও আন্দোরা সহ একগুচ্ছ পশ্চিমী দেশ। এই ঘোষণার ফলে জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য দেশের মধ্যে ১৫৯টি দেশ প্যালেস্তাইনকে স্বীকৃতি দিল—যা মোট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি। মঙ্গলবার সান মারিনোও এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

প্যালেস্তিনি কর্তৃপক্ষ (PA) এই পদক্ষেপকে ‘ঐতিহাসিক’ ও ‘গুরুত্বপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে প্রশংসা করলেও, গাজার রক্তাক্ত বাস্তবতা এই স্বীকৃতিকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠছে: এটি কি প্যালেস্তাইনের দীর্ঘ সংগ্রামের ন্যায্য সমাধানের পথে প্রকৃত অগ্রগতি, নাকি কেবলই এক প্রতীকী অভিনয়?

গাজার বাস্তবতা ও ফিলিস্তিনিদের ক্ষোভ
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রকের মহাপরিচালক ড. মুনির আল-বুর্শ পশ্চিমী দেশগুলোর এই ঘোষণাকে তীব্র কটাক্ষ করেছেন। তিনি বলেন, “একজন রোগী অপারেশন থিয়েটারে রক্তে ভেসে যাচ্ছে, আর ডাক্তার তার আইডি কার্ড যাচাই করছে—এটাই আজকের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ছবি।”

গত কয়েক বছরে ইজরায়েলের আগ্রাসী সামরিক অভিযানে অন্তত ৬৫,৫০০ প্যালেস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ গৃহহীন ও অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। এই প্রেক্ষাপটে শর্তসাপেক্ষ স্বীকৃতিকে ফিলিস্তিনি তৃণমূল কর্মীরা ‘অসংবেদনশীল’ বলে মনে করছেন।

শরণার্থী সংকট: যে অধিকার নিয়ে আপস নয়
এই স্বীকৃতিতে ফিলিস্তিনিদের সবচেয়ে বড় দাবি—১৯৪৮ সালে দেশছাড়া লক্ষ লক্ষ প্যালেস্তিনি ও তাঁদের উত্তরসূরিদের ‘ফিরে আসার অধিকার’—এর কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। জাতিসংঘের UNRWA-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্যালেস্তিনি শরণার্থীর সংখ্যা ৫.৯ মিলিয়ন (প্রায় ৫৯ লক্ষ)।

পশ্চিম তীরের সাংবাদিক হাফেজ আবু সাবরা সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “পশ্চিমীদের স্বীকৃতির অপেক্ষায় আমরা কখনও ছিলাম না, আজও নেই।” কর্মী আমিনা খন্দাকজি তীব্র ক্ষোভে বলেন, “আমাদের সেরা তরুণদের হারাতে হবে, তবেই তোমরা প্রতীকী স্বীকৃতি দেবে?” তাঁদের মতে, ইজরায়েলি দখলদারিত্ব, সীমান্ত অবরোধ এবং শরণার্থী সংকট অপরিবর্তিত থাকলে এই স্বীকৃতি অর্থহীন।

পশ্চিমী দেশগুলোর শর্ত ও ব্রিটিশ ইতিহাসের দায়
পশ্চিমী দেশগুলো প্যালেস্তাইনকে স্বীকৃতি দেওয়ার সঙ্গে একাধিক শর্ত জুড়ে দিয়েছে। প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—সম্ভাব্য প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রকে ‘নিরস্ত্র’ থাকতে হবে এবং হামাসকে বাদ দিতে হবে। প্যালেস্তিনি আন্দোলনের দাবি, দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মুক্তিসংগ্রাম আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাদের স্বীকৃত অধিকার, তাই এমন শর্ত আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী।

সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছে যুক্তরাজ্য। ১৯১৭ সালের ব্যালফোর ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটেনই ফিলিস্তিনে ‘ইহুদি জাতীয় স্বদেশ’ প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দিয়েছিল। ফিলিস্তিনিদের মতে, তাদের দীর্ঘ ১০৮ বছরের যন্ত্রণার জন্য ব্রিটেন সবচেয়ে বড় দায়ী। তাই ব্রিটেনের এই শর্তযুক্ত ও প্রতীকী স্বীকৃতি তাদের কাছে নতুন করে ক্ষত জাগিয়েছে।

স্বীকৃতি পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইজরায়েল কিং হুসেইন সেতু (অ্যালেনবি ব্রিজ) বন্ধ করে দেওয়ায় শীর্ষ প্যালেস্তিনি কর্মকর্তারাও আটকা পড়েন। বাস্তব চিত্র হলো, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন, সামরিক চৌকি এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ সবই এখনও ইজরায়েলের হাতে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ৮০ শতাংশের সমর্থন সত্ত্বেও, বাস্তবতার মাটিতে ফিলিস্তিনি জনগণ এখনও রক্ত, ক্ষুধা ও নির্বাসনের মধ্যে বেঁচে আছেন।