নেপালের মতো ভয়ংকর বন্যা কি কলকাতায় আছড়ে পড়তে পারে? জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় কি ভাসবে তিলোত্তমা?

নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়েছে। পাহাড়ি নদীর প্রবল স্রোত, হড়পা বান এবং বিস্তীর্ণ এলাকায় জল ঢুকে পড়ার ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব। আর ঠিক সেখান থেকেই কোটি টাকার প্রশ্নটি জোরালো হয়ে উঠছে—নেপালের মতো এমন সর্বগ্রাসী বন্যা কি ভবিষ্যতে কলকাতাতেও আঘাত হানতে পারে? বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই অঞ্চলের ভৌগোলিক গঠন সম্পূর্ণ আলাদা হলেও কলকাতার ক্ষেত্রে বন্যার ঝুঁকি বা জলসংকটকে ভুলেও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কলকাতা শহরটি মূলত একটি নিচু ও সমতল বদ্বীপ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। হুগলী নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই মহানগরীর বিস্তীর্ণ অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় খুব বেশি উঁচু নয়। ফলে অতিবৃষ্টি, নদীর জলস্তর বৃদ্ধি, নিকাশি ব্যবস্থার উপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো একাধিক বিপজ্জনক কারণ একসঙ্গে কাজ করলে শহরের অন্দরে জল জমার ভয়াবহ আশঙ্কা তৈরি হয়। রাষ্ট্রসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেল (IPCC)-এর মূল্যায়নগুলিতেও দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলীয় ও নিচু শহরগুলির বন্যা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির তীব্র ঝুঁকি নিয়ে বারবার সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষ করে সমুদ্রের জলস্তর বাড়লে তার দীর্ঘমেয়াদি ও মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে গোটা গঙ্গা-বদ্বীপ অঞ্চলে।
অবশ্য নেপালের বন্যার সঙ্গে কলকাতার সম্ভাব্য পরিস্থিতিকে এক করে দেখা বোকামি হবে। নেপাল একটি পাহাড়ি ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির দেশ, যেখানে মেঘভাঙা বৃষ্টি, পাহাড়ি নদীর জল হঠাৎ বেড়ে যাওয়া, হড়পা বান বা হিমবাহের হ্রদ ফেটে যাওয়ার মতো আকস্মিক ঘটনায় প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হয়। কিন্তু কলকাতার সমতল ও পলিগঠিত ভূপ্রকৃতিতে নেপালের মতো পাহাড়ি ফ্ল্যাশ ফ্লাডের কোনো সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনা নেই। কলকাতার আসল বিপদ লুকিয়ে রয়েছে অন্য জায়গায়। এখানকার প্রধান আশঙ্কা কোনো পাহাড়ি স্রোত নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং নগর বন্যা। অল্প সময়ে মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টি হলে কলকাতার পুরোনো ও নড়বড়ে নিকাশি ব্যবস্থা তার সঙ্গে পেরে ওঠে না।
এর সঙ্গে যদি হুগলী নদীর উচ্চ জোয়ার, নিম্নচাপ এবং অতিবৃষ্টির পরিস্থিতি একই সুতোয় বাঁধা পড়ে, তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। শহরের ক্রমবর্ধমান কংক্রিটের জঙ্গল বৃষ্টির জল মাটির নিচে ঢোকার স্বাভাবিক পথগুলোও আটকে দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে চরম আবহাওয়ার ঘনঘটা বাড়ছে, যার ফল ভুগতে হচ্ছে ঘনবসতিপূর্ণ বদ্বীপ শহরগুলোকে। তাই নেপালের মতো পাহাড়ি হড়পা বান কলকাতায় না আসলেও, দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সম্মিলিত আঘাত এড়াতে এখন থেকেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় নিকাশি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও জলাভূমি সংরক্ষণের সুদৃঢ় পরিকল্পনা প্রয়োজন।