নিউ মার্কেটের হোটেলে মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড! ঘন ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে প্রাণ হারালেন ৯ জন

কলকাতা শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও জনবহুল এলাকা নিউ মার্কেটের একটি বহুতল হোটেলের মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে গোটা রাজ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গত ১৯ আগস্ট রাতে প্রায় দুটো নাগাদ নিউ মার্কেটের একটি বাণিজ্যিক ভবনের নির্দিষ্ট একটি হোটেলের তলা থেকে হঠাৎই আগুনের সূত্রপাত হয়। জানা গিয়েছে, ওই বহুতল ভবনটির প্রতিটি ফ্লোরে আলাদা আলাদা হোটেল পরিচালিত হত। মূলত ৩ তলার একটি হোটেল থেকেই আগুনের সূত্রপাত ঘটে। যদিও আগুন লাগার প্রাথমিক তীব্রতা বা ভয়াবহতা খুব বেশি ছিল না, তবে হোটেলের ভেতর উৎপন্ন হওয়া মারাত্মক ও ঘন ধোঁয়া এক মর্মান্তিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ঘন ধোঁয়ার জেরে দৃশ্যমান্যতা শূন্যে নেমে আসায় বহু আবাসিক ও পর্যটক বাইরে বেরোনোর কোনো রাস্তাই খুঁজে পাননি।

পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে হোটেলের পরিকাঠামোগত ত্রুটিগুলি। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গেই হোটেলের সমস্ত বৈদ্যুতিক লিফট সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া জরুরি অবস্থা বা বিপদের সময় দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য যে ফায়ার এক্সিট বা ইমার্জেন্সি সিঁড়িটি ছিল, তা ছিল সম্পূর্ণ লোহার তৈরি। স্বাভাবিক নিয়মেই আগুন লাগার কারণে সেই লোহার সিঁড়ি অতিরিক্ত মাত্রায় গরম হয়ে যায়, যার ফলে ওই সিঁড়ি দিয়ে হুড়মুড়িয়ে নিচে নেমে আসা হোটেলের আটকে থাকা অতিথিদের পক্ষে কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, হোটেলের ভেতরেই বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মর্মান্তিকভাবে ৯ জনের মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও দমকল বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মৃতদেহগুলি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠায়। পাশাপাশি এই ঘটনায় গুরুতর অসুস্থ হওয়া আরও ৬ জন ব্যক্তিকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যেখানে তাঁদের চিকিৎসা চলছে।

এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরই রাজনৈতিক তরজাও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ঘটনাস্থলে দ্রুত ছুটে যান চৌরঙ্গী বিধানসভার বিজেপি প্রার্থী সন্তোষ পাঠক। রাজ্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে বলেন, “তৃণমূলের অবৈধ টাকার দরকার ছিল এবং বিভিন্ন বেআইনি কাজের মাধ্যমে টাকা জোগাড় করা হয়েছে, ফলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা তো ঘটতেই বাধ্য। আমি আসার পথেই শুনতে পেলাম এখানে বহু অবৈধ নির্মাণ রয়েছে। ঘরের ভেতরে পার্টিশন দিয়ে ছোট ছোট কামরা বানিয়ে অবৈধভাবে ভাড়া দেওয়া হতো। শুধু তাই নয়, পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশ থেকেও অনেকে এসে এখানে লুকিয়ে থাকতেন। গোটা বিষয়টাই সম্পূর্ণ বেআইনি।” তিনি আরও জানান, এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শুধুমাত্র নিউ মার্কেট এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো কলকাতা জুড়েই এই অবৈধ নির্মাণ ও কারবারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হবে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঙ্কারও দিয়েছেন তিনি।

সন্তোষ পাঠক আরও জানান যে, তিনি ইতিমধ্যেই এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পুরো বিষয়টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং অগ্নি ও জরুরি পরিষেবা মন্ত্রীকে বিস্তারিতভাবে জানিয়েছেন। এমনকি রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও যেকোনো মুহূর্তে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে পারেন বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে, দমকলমন্ত্রী ও প্রশাসনের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, এই অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ এবং পরিকাঠামোগত ত্রুটিগুলি খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে। অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা ও ফায়ার এক্সিটের মতো মৌলিক সুরক্ষাবিধি ছাড়াই কীভাবে বছরের পর বছর এমন হোটেলগুলি চলছিল, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।