নাসার পথেই হাঁটছে ইসরো! রকেট-স্যাটেলাইট তৈরি থেকে সরে দাঁড়ানোর নেপথ্যে কোন বড় ছক?

ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো (ISRO)-র কাঠামোগত পরিবর্তনে আসতে চলেছে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার (NASA) অনুকরণে এ বার দৈনন্দিন রকেট এবং স্যাটেলাইট তৈরির একঘেয়ে রুটিন কাজ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই মহাকাশ সংস্থা। সম্প্রতি ‘বিজনেস টুডে’-র এক শীর্ষ সম্মেলনে ‘ইন-স্পেস’-এর চেয়ারম্যান ড. পবন গোয়েঙ্কা এই ঐতিহাসিক পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে এনেছেন।
নতুন এই কৌশলগত সিদ্ধান্তের ফলে আগামী দিনে ইসরো আর কোনো বাণিজ্যিক রকেট কিংবা স্যাটেলাইট উৎপাদন করবে না। এর পরিবর্তে সংস্থার মূল ফোকাস হবে মহাকাশ বিজ্ঞানভিত্তিক মৌলিক মিশন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনা করা। গবেষণাগারে নতুন প্রযুক্তি সফলভাবে উদ্ভাবনের পরই তা বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য বেসরকারি ভারতীয় সংস্থাগুলির হাতে পুরোপুরি হস্তান্তর করা হবে।
বর্তমানে এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরুও হয়ে গিয়েছে। ইসরো তাদের ক্ষুদ্র স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ যান (SSLV)-এর প্রযুক্তি ইতিমধ্যে সফলভাবে বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে সংস্থার অন্যতম নির্ভরযোগ্য ওয়ার্কহর্স রকেট পিএসএলভি (PSLV) এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ভারী উৎক্ষেপণ যান এলভিএম-৩ (LVM3)-এর উৎপাদনও বেসরকারি ক্ষেত্রের ওপর অর্পণ করা হবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইসরো এখনও পর্যন্ত প্রায় ১২০টি উন্নত প্রযুক্তি বেসরকারি শিল্পমহলের কাছে স্থানান্তরিত করেছে। শুধু তাই নয়, আগামী চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে একটি নতুন মহাকাশ উৎক্ষেপণ কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্বও একজন বেসরকারি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের এই বড় পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো ভারতের মহাকাশ অর্থনীতির আকার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করা। বর্তমানে দেশের মহাকাশ অর্থনীতি প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি রয়েছে, যা ২০৩৩ সালের মধ্যে বাড়িয়ে ৪৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে দেওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে কেন্দ্র সরকার স্বয়ং ‘অ্যাঙ্কর কাস্টমার’ বা প্রধান ক্রেতা হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। একইসঙ্গে বেসরকারি শিল্পসংস্থাগুলিকে স্পেস টেকনোলজির বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে হবে। এই লক্ষে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ইতিমধ্যেই সদর্থক পদক্ষেপ গ্রহণ করে বেসরকারি সংস্থাকে একযোগে ৩১টি উন্নত উপগ্রহ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ অর্ডারও প্রদান করেছে।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা যেভাবে নিজস্ব মহাকাশ গবেষণার ওপর সম্পূর্ণ মনোযোগ केंद्रित করে স্পেস-এক্স কিংবা ব্লু অরিজিনের মতো বেসরকারি জায়ান্টদের হাতে উৎপাদন ও বাণিজ্যিক দায়িত্ব সঁপে দিয়েছে, ভারতের ইসরোও অবিকল সেই পথেই পা বাড়াল। এর ফলে দেশের উদীয়মান মহাকাশ শিল্পে অভূতপূর্ব গতি আসবে এবং ভারত বৈশ্বিক মহাকাশ বাণিজ্যের বাজারে এক অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।