‘ধুনার’ সুরেলা তাল এখন অতীত, আধুনিক ম্যাট্রেসের দাপটে ঐতিহ্যবাহী লেপ-তোষক তৈরির পেশা আজ সংকটে

শীতের আগমনী হাওয়া বইলেই একসময় বাংলার পাড়া-মহল্লায় ধুনকরদের কর্মব্যস্ততা শুরু হতো। তুলোর স্তূপ, ধুনার কাঠের পাটাতন থেকে ভেসে আসা মিহি রোঁয়ার মন ভোলানো শব্দ ছিল শীত আসার এক বিশেষ বার্তা। কিন্তু আধুনিক কম্বল, সস্তা ব্ল্যাঙ্কেট এবং কারখানায় তৈরি ম্যাট্রেসের আগমনে এই ঐতিহ্যবাহী পেশা আজ গভীর সংকটে।
পেশার পরিবর্তন:
সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে লেপ-তোষক তৈরির চিরাচরিত দৃশ্য এখন বিরল। বাজারের প্রতিযোগিতা বাড়ায় ভিন জেলা বা রাজ্য থেকে আসা ধুনকরদের কণ্ঠেও আজ হতাশার সুর।
একসময় বাড়ির ছাদ বা উঠোন জুড়ে যে লাল খোপকাটা লেপের কাপড়, তুলোর বস্তা আর ধুনার লাঠি দেখা যেত, সেই দৃশ্য এখন প্রায় লুপ্ত।
উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট থেকে সুন্দরবনের গ্রাম্য এলাকায় এখনও হাতে গোনা কিছু কারিগর দোকান বা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই পূর্বপুরুষের পেশা ধরে রেখেছেন।
লেপ তৈরির পদ্ধতি:
এই কারিগররা তুলো স্তূপ করে চ্যাপ্টা কাঠের পাটাতন দিয়ে ধুনতে ধুনতে হাতের ছন্দে তুলোর নরম রোঁয়া উড়িয়ে দেন। সেই ধোনা তুলোকে রঙিন কাপড়ের কভারের ভেতর ঢুকিয়ে শুরু হয় সুঁই-সুতোর সূক্ষ্ম কাজ, যা তুলোকে বেঁধে ফেলে এবং একটি লেপ বা তোষক তৈরি করে। এটি বাঙালির শীতের অত্যন্ত পরিচিত সঙ্গী।
অটুট নস্টালজিয়া:
তবে সব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, বাঙালির মন আজও এই পেশার প্রতি অটল। যত আধুনিক কম্বলই বাজার দখল করুক না কেন, পুরোনো সেই তুলোর লেপ মুড়ে না শুলে অনেকের কাছেই শীতের আসল উষ্ণতা ও আমেজ আসে না। সেই স্মৃতি এবং নরম উষ্ণতার টানেই হাতে গোনা কিছু মানুষ আজও নতুন লেপ তৈরি করতে বা পুরোনো লেপ ঝাড়াই করতে দেন। ধুনকরদের পেশা টিকে থাকার লড়াইয়ে হাঁপিয়ে উঠলেও, বাঙালির নস্টালজিয়া আজও এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছে।