“দুর্গার পাশে নয়, কেন ঠিক মাথার ওপরে থাকেন মহাদেব? জানলে অবাক হবেন!”

পুজো মণ্ডপে ঢুকলেই সবার প্রথমে চোখ আটকে যায় মা দুর্গার অপরূপ রূপ আর প্রতিমার চালচিত্রের ওপর। সাধারণত দেবী প্রতিমার মুখাবয়ব ও তাঁর হাতের নানা অস্ত্র দেখেই আমাদের নজর জুড়োয়। কিন্তু আপনি কি কখনও খেয়াল করেছেন, দেবীর ঠিক মাথার ওপরে ছোট্ট একটি স্থানে ধ্যানমগ্ন মুদ্রায় বসে থাকেন দেবাদিদেব মহাদেব? সঙ্গে থাকেন ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর মতো অন্যান্য দেবতারাও। কিন্তু প্রশ্ন হল, স্বামী হয়েও মহাদেব কেন স্ত্রীর পাশে না থেকে সবসময় মাথার ওপরে স্থান পান? এর পেছনে রয়েছে এক গভীর পৌরাণিক ব্যাখ্যা এবং বাংলার প্রাচীন শিল্প-ইতিহাসের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন।
১. পৌরাণিক ব্যাখ্যা – শক্তির উৎস ও আশীর্বাদের প্রতীক: শাস্ত্র অনুযায়ী, মা দুর্গা যখন অসুর বধ করতে মর্ত্যে বা রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন, তখন তিনি কেবল কারোর স্ত্রী হিসেবে থাকেন না; তিনি হলেন সাক্ষাৎ আদ্যাশক্তি ও জগৎজননী। এই বিশেষ সময়ে মহাদেব তাঁর স্বামী হিসেবে নয়, বরং তাঁর সৃষ্টিকর্তা এবং সমস্ত শক্তির আধার হিসেবে অবস্থান করেন। তাই তিনি পাশে না থেকে মাথার ওপরে আশীর্বাদক হিসেবে বিরাজ করেন।
পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে, মহাদেবের বুকের ওপর দাঁড়িয়েই দেবী কালী তাঁর রুদ্র রূপ ধারণ করেছিলেন। একইভাবে, দুর্গা রূপেও শিবের কাছ থেকেই শক্তি সঞ্চয় করেন দেবী। তাঁর মাথার ওপরে মহাদেবের থাকার অর্থ হলো, সমস্ত শক্তির উৎস স্বয়ং শিবই এবং তাঁর আশীর্বাদ নিয়েই দেবী অসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। পাশাপাশি, আরেকটি লোককথা এও বলে যে, দুর্গা যখন বাপের বাড়ি অর্থাৎ মর্ত্যে আসেন, তখন মহাদেব কৈলাসে একা থাকলেও সূক্ষ্ম রূপে চালচিত্রে অবস্থান করেন, যাতে কেউ দেবীর শক্তির অবমাননা করার সাহস না পায়।
২. শৈল্পিক ব্যাখ্যা – একচালা প্রতিমা ও চালচিত্রের ইতিহাস: বর্তমানে নানা থিম ও আধুনিকতার ছোঁয়া থাকলেও, সাবেকি বাঙালিয়ানার প্রধান অঙ্গ ছিল একচালা প্রতিমা। অর্থাৎ, একটাই বাঁশ ও খড়ের কাঠামোর মধ্যে মা দুর্গা ছাড়াও লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ—সবাই একসঙ্গে থাকেন। আর সেই গোটা কাঠামোর ঠিক পেছনে যে অর্ধচন্দ্রাকার ফ্রেম বা কাঠামো থাকে, সেটাই মূলত চালচিত্র।
পুরাণ ও শাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী, দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের মহাসংগ্রাম দেখতে স্বর্গ থেকে সমস্ত দেবতারা উপস্থিত হয়েছিলেন। সেই দেবতাদেরই প্রতীকী রূপ হিসেবে চালচিত্রের একদম ওপরের অংশে তাঁদের মূর্তি ফুটিয়ে তোলা হতো। আর যেহেতু দেবমণ্ডলীতে মহাদেব হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ, তাই স্বাভাবিকভাবেই তাঁর স্থান হয় একেবারে মাঝখানে, অর্থাৎ দেবীর মাথার ঠিক ওপরে।
আজও বাংলার কুমোরটুলির ঐতিহ্যবাহী শিল্পীরা এই প্রাচীন রীতি নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলেন। তাঁদের মতে, মাথার ওপর মহাদেব না থাকলে দুর্গা প্রতিমা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এটি নেহাতই কোনো মাটির মূর্তি নয়, বরং এটি হলো সনাতন ধর্মের শিব ও শক্তির মহামিলনের এক অপূর্ব প্রতীক।