দুর্গাপুজোয় মাছ-মাংস খাওয়া কি পাপ? বাগেশ্বর বাবার ফতোয়ায় তোলপাড় বাংলা, শাস্ত্র কী বলছে?

দুর্গাপুজোয় ‘আমিষ বনাম নিরামিষ’ বিতর্ক: শাস্ত্র, পুরাণ ও বাঙালির ঐতিহ্য কী বলছে?
হাতে আর মাত্র কয়েকদিন, তারপরেই বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো. সাজপোশাক থেকে পেটপুজো—সবকিছুর হিসেব কষা শুরু করে দিয়েছে আম-বাঙালির. তবে এ বছর পুজোর কেনাকাটার থেকেও খাওয়া-দাওয়া নিয়েই রাজ্যজুড়ে চলছে চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক তরজা. সৌজন্যে বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী (বাগেশ্বর বাবা)-র একটি মন্তব্য, যেখানে তিনি দুর্গাপুজোয় বাঙালিকে নিরামিষ খাওয়ার নিদান দিয়েছেন. এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই এফআইআর এবং রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে. এই আবহেই প্রশ্ন উঠছে, দুর্গাপুজোর সঙ্গে আমিষ খাওয়ার সম্পর্ক আসলে কোথায়? শাস্ত্র ও পুরাণই বা কী বলছে?
নবরাত্রি বনাম দুর্গাপুজো: খাদ্যাভ্যাসের ফার্ক কোথায়?
নবরাত্রির প্রথা: দেশের অন্যান্য অংশে নবরাত্রির নানা প্রথায় কঠোরভাবে নিরামিষ আহার ও উপবাসের ওপর জোর দেওয়া হয়. রক্ষণশীল বৈদিক ঐতিহ্যে শুচিতা ও মাংস বর্জনের প্রথাই প্রধান.
বাঙালির শাক্ত ঐতিহ্য: এর সম্পূর্ণ বিপরীতে, বাংলার দুর্গাপুজো গড়ে উঠেছে মূলত শাক্ত-তান্ত্রিক প্রভাবের ওপর ভিত্তি করে. এখানে নিরামিষ ও আমিষ—উভয় ধরনের খাবারেরই দীর্ঘকালীন প্রচলন রয়েছে.
খাদ্যাভ্যাস ও প্রথা: পরিবার ও সম্প্রদায় ভেদে রীতিনীতিতে ভিন্নতা থাকলেও, বহু বাঙালি পরিবারে উৎসবের পুরো সময়জুড়ে বা অষ্টমীতে আমিষ খাওয়ার চল রয়েছে. এমনকি দশমীর দিন বিদায় অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে মাছ (বিশেষ করে ইলিশ) খাওয়ার প্রচলন অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়.
শাস্ত্র ও পুরাণে আমিষ ভোগের অনুমতি
ভাগবত ও কালিকা পুরাণ: বাংলায় অনুসৃত শাক্ত মতবাদে (দেবী বা শক্তির উপাসনা) ভাগবত ও কালিকা পুরাণের মতো ধর্মে দুর্গা ও কালীর মতো দেবীর উগ্র রূপের উদ্দেশ্যে ‘বলি’ এবং ‘আমিষ ভোগ’ প্রদানের সুস্পষ্ট অনুমতি রয়েছে.
তান্ত্রিক দর্শন: তন্ত্রশাস্ত্রে জাগতিক জগতকে মায়া বলে অস্বীকার না করে তাকে আধ্যাত্মিক সাধনার অংশ হিসেবে দেখা হয়. কঠোর সংযমের বদলে জীবন, সৃষ্টি ও শক্তির প্রতীক হিসেবে মাছ ও মাংসের উপস্থিতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ.
কন্যারূপে পুজো: বাঙালি মা দুর্গাকে ঘরের মেয়ে হিসেবে দেখে. বাপের বাড়ি থেকে বিদায়ের সময় বরণ করার এই আনন্দঘন আয়োজনে সংযমের বদলে থাকে প্রাচুর্য ও এলাহি ভোজের আয়োজন.
শেষ কথা
গোটা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, দুর্গাপুজোর সময় আমিষ খাওয়া বাঙালির কাছে চিরাচরিত এক সাংস্কৃতিক অভ্যাস ও রীতিনীতি, যা ধর্মীয় ঐতিহ্যেরও পরিপন্থী নয়. তবে এটি সম্পূর্ণই একটি ব্যক্তিগত পছন্দ. পুজোয় আমিষ খাবে নাকি নিরামিষ, বাংলার মানুষ বরাবর তা নিজেরাই ঠিক করে এসেছে এবং এবারও তাই করবে—তা নিয়ে রাজনৈতিক জলঘোলা যতই হোক না কেন!
এই বিষয়ে আপনার মতামত কী? দুর্গাপুজোয় আমিষ খাবার পক্ষে নাকি বিপক্ষে আপনি? কমেন্টে জানান আমাদের!