‘তৃতীয় মেরু’-র ভয়ঙ্কর রূপ! হিমবাহ ফেটে লণ্ডভণ্ড নেপাল-তিব্বত সীমান্ত, চোখের নিমেষে সব সাফ

২৬ অগস্ট সকালে লেন্দে খোলা-ত্রিশূলী-নারায়ণী নদী পথ দিয়ে নেমে আসা কাদা-মাটির হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। নিখোঁজ প্রায় দেড় হাজার মানুষ। মনে করা হচ্ছে, এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মূল কারণ হিমবাহ ধস, বরফের চাঁই ভাঙা এবং সম্ভবত জমাট বাঁধা হিমবাহের হ্রদ ফেটে যাওয়া (গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা জিএলওএফ)। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে চিনের দিকে রাসুয়াগঢ়ীর উত্তর-পূর্বে প্রায় ২০ কিমি দূরে অবস্থিত এই জলাশয়ে ফাটল ধরার ফলেই এই বিপর্যয় ঘটে। হড়পা বানের জলরাশি কোথাও কোথাও ৮ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু ছিল। আধ ঘণ্টার মধ্যে ত্রিশূলীর মালেখুতে ৭ মিটার এবং গালচিতে ঢেউয়ের উচ্চতা ৯ মিটার পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়। এই দানবাকৃতি ঢেউয়ের তোড়ে তিমুর, রাসুয়াগঢ়ীর বিভিন্ন এলাকা, সায়াপ্রুবেশির অংশবিশেষ, মেলাং, শান্তিবাজার এবং বেত্রাবতীর পথে যা কিছু ছিল সব ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গিয়েছে। এই বিধ্বংসী হড়পা বানে ১২টি জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র (যার মধ্যে ৪৩১.১ মেগাওয়াটের ক্ষমতা সম্পন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রও রয়েছে) গ্রিড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, অন্তত ১৯টি সেতু এবং প্রায় ৪০ কিমি রাস্তা স্রেফ ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে।
ঠিক কী কারণে নেপালে এই বিপর্যয় ঘটল, তা খতিয়ে দেখতে বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইটে তোলা ছবি এবং আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করছেন। প্রাথমিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, দুর্ঘটনাগ্রস্ত এলাকায় ৪.৪ থেকে ৪.৯ তীব্রতার ভূকম্পনের ফলে হিমবাহে ফাটল ধরে এই বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। আমেরিকার জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) অবশ্য ভূমিকম্পের তত্ত্বকে খারিজ করে এর জন্য হিমবাহ ধস এবং পাহাড় থেকে পাথর ও মাটি ধসে পড়াকেই দায়ী করেছে। নেপাল ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (এনডিএমএ) জানিয়েছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের রাসুয়াগঢ়ীর উত্তর-পূর্বে লেন্দে নদীতে ধ্বংসস্তূপ জমে এই ভয়াবহ ধস নেমেছিল। ন্যাশনাল রিমোট সেনসিং সেন্টার (এনআরএসসি)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের উৎসস্থল তিব্বতের পাহাড়-পর্বত। ২৬ অগস্ট সকাল ৮টা ২২ মিনিটে রাসুয়া এলাকার কাছে ১০ কিমি গভীরে ৪.৯ তীব্রতার ভূকম্পন হয়েছিল, যার ফলে জিরক গ্লেসিয়ার ফেটে বরফ ও পাথরের বিশাল চাঁই খাড়াই ঢাল বেয়ে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ অবরুদ্ধ করে দেয়।
হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দ্রুত গতিতে বরফ গলছে। আর্কটিক এবং অ্যান্টার্কটিকার পর হিমালয়ে সবচেয়ে বেশি হিমবাহ থাকায় একে পৃথিবীর ‘তৃতীয় মেরু’ বলা হয়। পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে শতবর্ষের প্রাচীন বরফের স্তর গলে এই ধরনের ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এর আগে ২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডের চামোলি বিপর্যয়, সুইজারল্যান্ডে হিমবাহ ধসে ব্লাটেন গ্রামের ধ্বংস এবং ২০২৩ সালে জর্জিয়ায় ৩৩ জনের মৃত্যুর ঘটনাও দ্রুত হিমবাহ গলারই ফল। সুইজারল্যান্ডের মতো উন্নত দেশগুলিতে আগেভাগে সতর্কবার্তা জারির ব্যবস্থা থাকলেও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এই ব্যয়বহুল পরিকাঠামো তৈরি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। হিমবাহ গলে এই জল নদী হয়ে নেপাল, ভারত, পাকিস্তান এবং চিনের কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছলেও এই সংকট এড়াতে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন হ্রাস করা এবং পাহাড়ি অঞ্চলে সর্বক্ষণের নজরদারি জরুরি।