ডগফাইটের সেই ঐতিহাসিক নায়ক! পাকিস্তানের চোখে চোখ রেখে লড়াই করা অভিনন্দন বর্তমানের কেরিয়ারে এবার বিরাট বদল!

ভারতের বীর ফাইটার পাইলট এবং দেশবাসীর হৃদয়ের মণিকোঠায় থাকা গ্রুপ ক্যাপ্টেন অভিনন্দন বর্তমান ভারতীয় বায়ুসেনা (IAF) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করে এক সম্পূর্ণ নতুন কর্মজীবন শুরু করেছেন। সংবাদ সংস্থা পিটিআই-এর বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে জানা গিয়েছে যে, বিমান বাহিনীতে সুদীর্ঘ ২২ বছরের অত্যন্ত গৌরবময় ও সফল দেশসেবা শেষে তিনি এবার একটি বেসরকারি বিমান সংস্থায় বাণিজ্যিক পাইলট হিসেবে যোগ দিয়েছেন। গত আগস্ট মাসেই তিনি গোয়াভিত্তিক উদীয়মান আঞ্চলিক বিমান সংস্থা ‘ফ্লাই৯১’ (FLY91)-এ পাইলট হিসেবে নতুন এই ইনিংস শুরু করেন। প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের উত্তপ্ত ফেব্রুয়ারি মাসে জম্মু-কাশ্মীরের আকাশে পাক সেনার সঙ্গে ঐতিহাসিক ডগফাইটে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তানের একটি অত্যাধুনিক এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মাটিতে নামিয়েছিলেন তিনি। যদিও সেই আকাশযুদ্ধে তাঁর নিজের চালিত মিগ-২১ বাইসন বিমানটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভূপতিত হয় এবং শত্রুর হাতে বন্দি হয়ে টানা তিন দিন পাকিস্তানে কারাবাস করতে হয়েছিল তাঁকে।
তবে এই নতুন কর্মজীবন ও যোগদান প্রসঙ্গে বর্তমান এবং সংশ্লিষ্ট বেসরকারি বিমান সংস্থার পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়নি। ‘ফ্লাই৯১’-এর একজন দায়িত্বশীল মুখপাত্র কর্মীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কথা উল্লেখ করে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, এটি একান্তই একজন কর্মীর ব্যক্তিগত বিষয়, তাই এই বিষয়ে তারা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করবেন না। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে বাণিজ্যিকভাবে তাদের কার্যক্রম শুরু করা ‘ফ্লাই৯১’ বিমান সংস্থাটি বর্তমানে অত্যন্ত সফলভাবে ছয়টি আধুনিক এটিআর ৭২-৬০০ (ATR 72-600) বিমানের একটি শক্তিশালী বহর পরিচালনা করছে। গোয়া এবং হায়দরাবাদ—এই দুটি প্রধান ঘাঁটিকে কেন্দ্র করে বর্তমানে তাদের অভ্যন্তরীণ বিমান পরিষেবা পরিচালিত হচ্ছে।
অভিনন্দন বর্তমানের এই বীরত্বগাথার শুরু ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের পটভূমিতে। পুলওয়ামায় মর্মান্তিক আত্মঘাতী বোমা হামলায় সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সিআরপিএফ) ৪০ জন জওয়ান শহিদ হওয়ার পর ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী পাক ভূখণ্ডে ঢুকে সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটিতে দুঃসাহসিক বিমান হানা চালায়। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে সেসময় স্পষ্ট জানানো হয়েছিল যে, এই সার্জিক্যাল ও বিমান হামলাগুলি বালাকোটে অবস্থিত নিষিদ্ধ জঙ্গি গোষ্ঠী জইশ-ই-মহম্মদের প্রধান প্রশিক্ষণ শিবিরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার লক্ষ্যেই চালিত হয়েছিল। এর ঠিক পরের দিন পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর আকস্মিক পাল্টা পদক্ষেপের ফলে দুই প্রতিবেশী পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশের মধ্যে এক ভয়াবহ ও সর্বাত্মক যুদ্ধের উপক্রম হয়েছিল।
সেই উত্তাল ও চরম সংকটের মুহূর্তেই বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিলেন তৎকালীন উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান। শত্রু দেশের এফ-১৬ বিমান ধ্বংস করার পরপরই তাঁর মিগ-২১ যুদ্ধবিমানটি আকাশেই আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং তিনি ইজেক্ট করে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে নেমে এলে তাঁকে বন্দি করা হয়। তাঁর এই সাহসিকতা এবং বন্দিদশার ঘটনা দুই দেশের মধ্যে বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর সামরিক ও কূটনৈতিক সংকট তৈরি করেছিল। ২০১৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি এই ঘটনা ঘটার পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে পাকিস্তান ১ মার্চ রাতে তাঁকে সসম্মানে ভারতে ফেরত পাঠাতে বাধ্য হয়েছিল।
আকাশযুদ্ধের সময় মিগ-২১ বাইসন বিমান থেকে জরুরি ভিত্তিতে ইজেক্ট করার সময় তাঁর পিঠে ও শরীরে গুরুতর আঘাত লেগেছিল। তবে দেশমাতৃকার সুরক্ষায় তাঁর এই অপরিসীম বীরত্ব, সাহসিকতা এবং অসাধারণ কর্তব্যবোধের স্বীকৃতি স্বরূপ ওই বছরেরই পরবর্তী সময়ে তাঁকে ভারতের যুদ্ধকালীন বীরত্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘বীর চক্র’-এ ভূষিত করা হয়। বায়ুসেনার নীল আকাশ থেকে অবসর নিলেও, ককপিটে তাঁর এই ফিরে আসা এবং নতুন বাণিজ্যিক উড়ান সাধের আকাশকে ফের একবার মনে করিয়ে দিচ্ছে দেশের এই লড়াকু নায়ককে।