টালিখোলার চাল থেকে সংগ্রহশালা! কিংবদন্তি শিল্পীর স্মৃতি রক্ষায় এবার ঐতিহাসিক উদ্যোগ!

অসম এবং বাংলার দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের অন্যতম প্রধান সেতুবন্ধন ছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী সুধাকণ্ঠ ভূপেন হাজারিকা। তাঁর ভরাট কণ্ঠের জাদুতে আজও বুঁদ হয়ে থাকে দুই রাজ্য। তাঁর জীবনের একটা দীর্ঘ সময় কেটেছে এই কলকাতায়। তাঁর সংগীত জীবনের উত্থান এবং বিস্তার অনেকটাই এই শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। টালিগঞ্জের গলফ ক্লাব রোডে রয়েছে তাঁর সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি, যেখানে বসেই তিনি সৃষ্টি করেছেন বহু কালজয়ী গান। এই বাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দুই রাজ্যের আপামর সংগীতপ্রেমী মানুষের গভীর আবেগ। এবার সেই ঐতিহাসিক বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য যৌথভাবে উদ্যোগী হলো অসম সরকার। এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহযোগিতা ও আইনি পদক্ষেপ চেয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে একটি বিশেষ চিঠি পাঠিয়েছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা।

অসমের মুখ্যমন্ত্রী তাঁর চিঠিতে ভূপেন হাজারিকার সঙ্গে কলকাতার আত্মিক ও গভীর সম্পর্কের কথা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেছেন। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “ভূপেন হাজারিকা শুধুমাত্র অসমের গর্ব নন, তিনি সমগ্র ভারত তথা বাংলারও এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর কলকাতার বাসভবনটি আমাদের কাছে এক পবিত্র তীর্থস্থানের মতো। অসমের আপামর জনসাধারণের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে এই বাড়িটির সঙ্গে। এই স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি সংরক্ষণের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সার্বিক সহযোগিতা একান্ত কাম্য।” রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলের একাংশের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে বাংলা ও অসমের মধ্যকার সুপ্রাচীন সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও অনেক বেশি দৃঢ় হবে।

সূত্রের খবর অনুযায়ী, অসম সরকার চাইছে বাড়িটি অধিগ্রহণ করে সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ সংগ্রহশালা বা আন্তর্জাতিক মানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে। যেখানে ভূপেন হাজারিকার জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তের ব্যবহৃত নানা জিনিসপত্র, তাঁর দুর্লভ গানের রেকর্ড, অমূল্য পাণ্ডুলিপি এবং বহু অজানা ছবি সুসংরক্ষিত থাকবে। এর ফলে আগামী প্রজন্মের তরুণ শিল্পীরা এই মহান শিল্পীর সৃষ্টি এবং বর্ণময় জীবন সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানার সুযোগ পাবে। চিঠিতে এমন জোরালো ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে যে, এই অধিগ্রহণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের সম্পূর্ণ আর্থিক দায়ভার বহন করতে প্রস্তুত রয়েছে অসম সরকার। তবে যেহেতু বাড়িটি পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক সীমানা ও এক্তিয়ারভুক্ত, তাই আইনি প্রক্রিয়ার কাজ সম্পন্ন করতে রাজ্য সরকারের সবুজ সংকেত একান্ত প্রয়োজন।

পঞ্চাশের দশকে সুদূর অসম থেকে কলকাতায় পা রেখেছিলেন ভূপেন হাজারিকা। এখানে এসেই তিনি জড়িয়ে পড়েছিলেন বিখ্যাত ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গে। এই শহরের মাটি ও বাতাস তাঁকে দ্রুত নিজের করে নিয়েছিল। হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় কিংবা লতা মঙ্গেশকরের মতো দিকপাল ও কিংবদন্তি শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল এই কলকাতা শহরেই। গঙ্গার তীর থেকে শুরু করে দক্ষিণের কফি হাউসের আড্ডা— সবকিছুই তাঁর গানে ও যাপনে উঠে এসেছে বারবার। অসমিয়া লোকসঙ্গীতের সঙ্গে বাংলার আধুনিক গানের যে অপূর্ব সেতুবন্ধন তিনি করেছিলেন, তার সবচেয়ে বড় সাক্ষী এই কলকাতা শহর। তাই অসমের পাশাপাশি এই বাংলাও তাঁকে নিজের ঘরের ছেলেই মনে করে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এই চিঠি পৌঁছানোর পর এখন পুরো বিষয়টি নিয়ে বল রয়েছে নবান্নের কোর্টে। প্রশাসনিক স্তরে বিষয়টি নিয়ে দ্রুত ইতিবাচক আলোচনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল। সংস্কৃতি ও শিল্প সাধনাকে কদর করার ক্ষেত্রে বাংলার চিরকালই এক উজ্জ্বল সুনাম রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দফতরগুলি এই প্রস্তাব গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছে। আইনি বা প্রযুক্তিগত বড় কোনো বাধা না থাকলে, এই ঐতিহাসিক বাড়ি সংরক্ষণের বিষয়ে বাংলা যে অসমকে সবরকম সাহায্য করবে, তা একপ্রকার নিশ্চিত। এখন দেখার, নবান্ন এবং অসম সরকার যৌথভাবে কত দ্রুত এই প্রকল্পটিকে বাস্তবে রূপায়িত করতে পারে।