দিল্লির বুকে মর্মান্তিক পরিণতি! মদ্যপানে বাধা দেওয়ায় মণিপুরি সঙ্গীতশিল্পীকে পিটিয়ে খুন

রাজধানী দিল্লির দক্ষিণ-পূর্ব জেলার সানলাইট কলোনি থানার অন্তর্গত কিলোকারি গ্রামে এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে গেছে। যেখানে সামান্য প্রতিবাদ করার অপরাধে ৫৪ বছর বয়সী বিশিষ্ট মণিপুরি সঙ্গীতশিল্পী চ্যাংফাম বিক্রম সিংকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই লোমহর্ষক ঘটনার পর পুলিশের দায়ের করা এফআইআর-এ বেশ কিছু অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, যা পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। নিহত শিল্পীর ২০ বছর বয়সী ছেলে ইয়াইফাবার প্রত্যক্ষ জবানবন্দির ভিত্তিতে পুলিশ ইতিমধ্যেই একটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা নথিভুক্ত করেছে এবং অপরাধীদের ধরতে জোরদার তল্লাশি শুরু করেছে।

নিহতের ছেলে ইয়াইফাবা বর্তমানে নয়ডার স্বনামধন্য এশিয়ান ল কলেজ থেকে বিএ/এলএলবি কোর্সের আইন নিয়ে পড়াশোনা করছেন। পুলিশকে দেওয়া তাঁর দীর্ঘ জবানবন্দি অনুযায়ী, পুরো ঘটনাটি ঘটে গত ৬ই সেপ্টেম্বর রাতে। ওই দিন আনুমানিক রাত সাড়ে এগারোটার দিকে ইয়াইফাবা কিলোকারি গ্রামের তাঁদের নিজস্ব বাসভবনের (ফ্ল্যাট নং ৯, তৃতীয় তলা, বাড়ি নং ১৪৮ এ/১) ঘরের ভেতরে উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ করেই তিনি বাইরে থেকে তাঁর বাবা চ্যাংফাম বিক্রম সিং-এর বাঁচার আকুতি ও চিৎশব্দ শুনতে পান। হতভম্ব হয়ে তিনি দ্রুত দরজা খুলে বাইরে তাকান এবং যা দেখতে পান তা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

ছেলেটি দেখতে পায় যে চার থেকে পাঁচজন উশৃঙ্খল যুবক মিলে তাঁর বাবাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে এলোপাথাড়ি লাথি ও ঘুষি মারছে। চোখের সামনে বাবার ওপর এমন বর্বর আক্রমণ দেখে ইয়াইফাবা আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে ওঠেন। ছেলের চিৎকার শুনে ও স্থানীয়দের উপস্থিতি টের পেয়ে আক্রমণকারীরা সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে অন্ধকার ও হুড়োহুড়ির মধ্যেও ইয়াইফাবা তাদের মুখ স্পষ্ট দেখতে পান এবং অপরাধীদের চেহারা তাঁর মনে গেঁথে যায়।

ঘটনার পরপরই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে ইয়াইফাবা তাঁর মা জোশনা চংথাম এবং এক প্রতিবেশী রাডোকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত একটি ট্যাক্সি ডেকে বাবাকে নিউ ফ্রেন্ডস কলোনির বিখ্যাত হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে ছোটেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সেই মারাত্মক সংকটময় মুহূর্তে, আহত বাবা ট্যাক্সির ভেতরেই তাঁর ছেলেকে শেষবারের মতো জানান যে, হামলাকারীরা সবাই ঠিক নিচের রেস্তোরাঁটি থেকেই এসেছিল। বিক্রম সিং এর আগে তাদের ওই এলাকায় মদ্যপান করতে ও গোলমাল সৃষ্টি করতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু সেই বারণ করার অপরাধেই অভিযুক্তরা তাঁকে ক্রমাগত হুমকি দিয়ে আসছিল। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই যন্ত্রণায় কাতর বাবা পথেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিক্রম সিং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এফআইআর নথিপত্র অনুসারে, পুলিশ কর্মকর্তা এএসআই বীরেন্দ্র যখন দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছান, তখন চিকিৎসকেরা আহত বিক্রম সিংকে তাঁর সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থার কারণে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সম্পূর্ণরূপে অযোগ্য ঘোষণা করেন। এই কারণে দুর্ভাগ্যবশত তাঁর কোনো মৃত্যুকালীন জবানবন্দি রেকর্ড করা সম্ভব হয়নি। এর পরদিন সকালে, অর্থাৎ ৭ সেপ্টেম্বর আনুমানিক সকাল ১০:০২ মিনিটে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের মর্মান্তিক মৃত্যুর সংবাদ জানায়।

এই ঘটনার পর ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশে মৃতদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য এইমস (AIIMS) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা এএসআই বীরেন্দ্রের দায়ের করা অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে সানলাইট কলোনি থানায় একটি কঠোর ধারায় মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তীতে এই স্পর্শকাতর মামলার সম্পূর্ণ তদন্তভার ইন্সপেক্টর মুকেশ কুমার (এসএইচও)-এর হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। ভারতীয় আইন (আইপিসি, ২০২৩)-এর ধারা ১০৩(২)/৩(৫)-এর অধীনে মামলাটি রুজু করা হয়েছে। বর্তমানে পুলিশ আশেপাশের সমস্ত রেস্তোরাঁ ও হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছে এবং পলাতক ঘাতকদের ধরতে চিরুনি তল্লাশি চালাচ্ছে।