জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী আসন পাওয়ার পথে কাঁটা কোথায়? রাশিয়ার সায় মিললেও বড় চাল বাকি!

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে (UNSC) ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবি ফের একবার আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জোরালো হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ সভার ৮১তম অধিবেশনে রাশিয়া স্পষ্টভাবে ভারত ও ব্রাজিলের এই দাবিকে সমর্থন জানিয়েছে। মস্কোর এই ঘোষণা কूटনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হলেও, প্রশ্ন উঠছে—ভারত কি খুব সহজেই এই স্থায়ী আসন পেয়ে যাবে? নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে জটিল আইনি ও রাজনৈতিক বেড়াজাল?

রাশিয়ার সমর্থন এবং জি-৪ সমীকরণ

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ জাতিসংঘে ভারতের পাশাপাশি ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পক্ষে সওয়াল করেছেন। একই সঙ্গে জার্মানি ও জাপানকে স্থায়ী सीट দেওয়ার বিরোধিতা করেছে মস্কো। উল্লেখ্য, ভারত, ব্রাজিল, জার্মানি এবং জাপান—এই চার দেশ ‘জি-৪’ (G-4) গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ সম্প্রসারণের দাবি তারা দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছে। রাশিয়ার এই আংশিক সমর্থন ভারতের কूटনৈতিক জয় হলেও, এর ফলে রাতারাতি স্থায়ী সদস্য হওয়ার রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে না।

কোথায় আটকে রয়েছে আসল পेंच?

ইউএন-এর স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার মূল বাধা লুকিয়ে রয়েছে জাতিসংঘের নিজস্ব গঠনতন্ত্র এবং জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে:

  • চার্টার সংশোধন: জাতিসংঘ সনদের ১০৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্থায়ী সদস্য বাড়াতে হলে সাধারণ সভায় দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। এরপর সদস্য দেশগুলির অনুমোদন এবং নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান পাঁচ স্থায়ী সদস্যের (P5) সম্মতি বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, কোনো একটি দেশের ভেটো বা অসম্মতি পুরো প্রক্রিয়াটিকে ভেস্তে দিতে পারে।

  • সদস্য দেশগুলির মতপার্থক্য: নতুন স্থায়ী সদস্য কারা হবে, তা নিয়ে এখনও বিশ্বজুড়ে একমত হতে পারেনি দেশগুলি। জি-৪ দেশের পাশাপাশি আফ্রিকার দেশগুলিও স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব দাবি করছে। আবার অনেক দেশই বড় কোনো পরিবর্তন বা নতুন দেশকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিরোধী।

  • ভিটোর ক্ষমতা ও সমীকরণ: নতুন স্থায়ী সদস্যদের হাতে ‘ভিটো’ (Veto) ক্ষমতা থাকবে কি না, তা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা। যদি ভিটো না দেওয়া হয়, তবে তাদের ক্ষমতা পুরনো পাঁচ শক্তির চেয়ে কম থাকবে। আর যদি ভিটো দেওয়া হয়, তবে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া এই পুরো প্রক্রিয়ায় চীনের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল।

স্থায়ী আসন পেলে ভারতের কী লাভ হবে?

ভারত যদি শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ অর্জন করে, তবে বিশ্বমঞ্চে দেশের কूटনৈতিক ওজন বহুগুণ বেড়ে যাবে। এর ফলে বৈশ্বিক শান্তি, সন্ত্রাসবাদ দমন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলিতে নিয়মিত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বজায় রাখতে পারবে ভারত। একই সঙ্গে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল দেশগুলির মুখ হিসেবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারতের গুরুত্ব আরও দৃঢ় হবে। তবে এই সমস্ত সুবিধার পথ প্রশস্ত করতে হলে বিশ্বনেতাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও কঠিন রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন।