‘চোর ঢুকলে ভাববে ছাড়া পাই, পুলিশ ভাববে আসামি ধরে!’ থানায় থানায় কালীপুজো নিয়ে কেন এত বিতর্ক?

রাজ্যের প্রতিটি থানায় নিয়ম করে কালীপুজো করার আহ্বান জানালেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর প্রস্তাব, স্কুলে যেমন সরস্বতী পুজো বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গ, তেমনই রাজ্যের প্রতিটি থানায় কালীমূর্তি রেখে নিয়মিত পুজো করা উচিত এবং তা যেন পুলিশি সংস্কৃতিরই একটি অংশ হয়ে ওঠে। প্রশাসনের এমন ‘ধর্মীয়করণ’ ও সংবিধানবিরোধিতা নিয়ে বিরোধীরা ইতিমধ্যে সরব হলেও, বাংলার থানাগুলিতে কালীপুজোর ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও ঐতিহ্যমণ্ডিত।

কী বিতর্কিত মন্তব্য করলেন মন্ত্রী?

মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “রঘু ডাকাতও কিন্তু ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে মা কালীর পুজো করে যেতেন। এটার মধ্যে ধর্মাচার নেই। থানায় কালীমূর্তি থাকা দরকার। চোর যখন থানায় ঢুকবে, তখন মনে মনে বলবে মা যেন ছাড়া পাই। আর পুলিশ যখন বেরোবে, তখন প্রার্থনা করবে, আসামি যেন ধরা পড়ে।”

পাশাপাশি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করে তিনি বলেন, “বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য থানায় কালীপুজো করতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মা কালীকে প্রিজন ভ্যানে তুলেছিলেন— এই দুইয়ের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ থানায় থানায় কালীপুজো করুক।”

থানায় থানায় কালীপুজোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ডাকাত দলের চরম উপদ্রব ছিল। রঘু ডাকাত, বিশে ডাকাত বা বুধো ডাকাতের মতো কুখ্যাত দস্যুরা ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে শক্তির দেবী মা কালীর আরাধনা করত। লোকবিশ্বাস ছিল, দেবীর কৃপা ছাড়া লুণ্ঠনে জয়লাভ অসম্ভব।

অন্যদিকে, পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গ কর্তারা ভারতীয় অধস্তন পুলিশ কর্মীদের সঙ্গে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করতেন এবং সনাতন ধর্মের রীতিনীতিকে ‘বর্বরতা’ বলে অবজ্ঞা করতেন। ব্রিটিশদের এই বর্ণবাদী মানসিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে এবং নিজেদের আত্মপরিচয় জাহির করতে ভারতীয় পুলিশ কর্মীরা থানার ভেতরেই মহাশক্তি দেবী কালীর আরাধনা শুরু করেন। দেবী কালী অত্যাচারী অসুর বিনাশের প্রতীক হওয়ায়, তা সে সময়ের বাঙালি বিপ্লবীদের ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়েও অদৃশ্য অনুপ্রেরণা জোগাত।

বারোয়ারি বনাম থানার পুজোর বিশেষত্ব

সাধারণ বারোয়ারি পুজোর চেয়ে থানার কালীপুজোর আবহ ও প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। ব্রিটিশ আমল থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন থানা প্রাঙ্গণে বা আশপাশে তান্ত্রিক মতে মা কালীর আরাধনা হয়ে আসছে:

  • গঙ্গারামপুর ও চাঁচল: দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর থানাপাড়ার কালীপুজো ব্রিটিশ আমল থেকেই চলে আসছে, যেখানে পঞ্চমুণ্ডির আসন তৈরি করে তন্ত্রমতে পুজো হয় এবং বোয়াল মাছের ভোগ দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। একইভাবে মালদার চাঁচল থানার কালীপুজোও অত্যন্ত জনপ্রিয়।

  • সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: এই পুজো শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক থানায় বহু প্রাচীন কাল থেকেই কোনো মুসলিম ওসি-র উদ্যোগে বা অহিন্দু পুলিশ কর্মীদের সক্রিয় সহযোগিতায় ধুমধাম করে এই পুজো পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে এই পুজোকে কেন্দ্র করে রক্তদান শিবির, বস্ত্র বিতরণ এবং গরিব মানুষকে অন্নদান করার মতো জনকল্যাণমূলক কাজও করা হয়।

বাম ও তৃণমূল জমানায় কী ছিল পরিস্থিতি?

রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বামফ্রন্ট সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এর সমর্থক না হলেও, পুলিশ সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বহু থানায় কর্মীরা নিজস্ব উদ্যোগে কালীপুজো করতেন। তৃণমূল সরকারের আমলেও সেই ধারা অব্যাহত থেকেছে। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে কোনো লিখিত নির্দেশিকা না থাকলেও, স্থানীয় স্তরে পুলিশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও প্রাচীন প্রথার অংশ হিসেবে রাজ্যের বহু থানায় ঐতিহাসিকভাবেই এই পুজোর আয়োজন হয়ে আসছে। মন্ত্রীর সাম্প্রতিক এই আহ্বানের পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে চর্চা শুরু হয়েছে।