চাকরি হারাচ্ছেন ১ লাখ কর্মী! ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাতে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ভক্সওয়াগেনের!

বিশ্বব্যাপী অটোমোবাইল শিল্পে বৈদ্যুতিক গাড়ির (ইভি) চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়া এবং চীনা গাড়ি নির্মাতাদের কাছ থেকে আসা তীব্র প্রতিযোগিতার জেরে জার্মান অটোমোবাইল জায়ান্ট ভক্সওয়াগেন গ্রুপ এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। বিশ্ব অটোমোবাইল শিল্পের দীর্ঘ ইতিহাসে এটি অন্যতম বৃহত্তম পুনর্গঠন অভিযান হিসেবে বিবেচিত হতে চলেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানির বোর্ড একটি অত্যন্ত ব্যাপক পরিবর্তনের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, যার অধীনে বিশ্বব্যাপী গ্রুপ পর্যায়ে প্রায় ১ লক্ষ কর্মী ছাঁটাই করা হবে। ইউরোপের অভ্যন্তরে উচ্চ পরিচালন ব্যয়, অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতার চাপ এবং ইভি-তে রূপান্তরের পথপরিক্রমায় সৃষ্ট তীব্র আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্যই এই কঠোর ও অপরিহার্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
জার্মান গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফোক্সভাগেন জানিয়েছে যে, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো যৌথভাবে এই দশকের শেষ নাগাদ মোট ১ লক্ষ কর্মী ছাঁটাই করার বিষয়ে একমত হয়েছে। পূর্বে নির্ধারিত ৫০ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনার সঙ্গে আরও অতিরিক্ত ৫০ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছে। ভক্সওয়াগেন, অডি এবং পোর্শের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলি এই গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। ইউরোপের বৃহত্তম এই গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে মার্কিন শুল্ক নীতি, ইভি গাড়ির শ্লথ চাহিদা এবং বিশেষভাবে চীনের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বাজারের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে গুরুতর সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। বিশ্বব্যাপী মোট কর্মীসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশের এই ছাঁটাই ২০০৯ সালে জেনারেল মোটরসের দেউলিয়া হওয়ার পরবর্তী সময়কার ৫০ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের রেকর্ডকেও অতিক্রম করে গেছে, যা মোটরগাড়ি শিল্পের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
শুধু কর্মী ছাঁটাই নয়, ফোক্সভাগেন আরও জানিয়েছে যে জার্মানিতে অবস্থিত তাদের চারটি প্রধান কারখানা—হ্যানোভার, এমডেন, জভিকাউ এবং নেকারসুলমের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সংস্থাটি এই কারখানাগুলোর বিকল্প ব্যবহারের কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। যদি শেষ পর্যন্ত এই কারখানাগুলি বন্ধ করে দিতে হয়, তবে অটোমোবাইল শিল্পের ইতিহাসে এই প্রথম ফোক্সভাগেন নিজ দেশে তাদের নিজস্ব কারখানা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার চরম সিদ্ধান্ত নেবে। জভিকাউ কারখানার দীর্ঘকালীন কর্মী মার্টিন লেহমান এএফপি-কে জানিয়েছেন যে, এই কারখানাগুলো বন্ধ হলে তা সমগ্র অঞ্চলের অর্থনীতি এবং এর ওপর নির্ভরশীল সরবরাহকারীদের জন্য এক বিশাল অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনবে।
ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলির মধ্যে নানা টানাপোড়েন ও প্রকাশ্য দ্বন্দ্বের পর অবশেষে ভক্সওয়াগেনের তত্ত্বাবধায়ক পর্ষদ এই ব্যাপক পরিকল্পনাগুলো সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করেছে। সিইও অলিভার ব্লুম একে ভক্সওয়াগেন গ্রুপের ভবিষ্যতের জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ইতিবাচক সংকেত হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর আগে পরিকল্পনা ফাঁস হওয়াকে কেন্দ্র করে ইউনিয়নগুলি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল এবং আইজি মেটাল ইউনিয়ন বিষয়টিকে “বাজে কথা, অযৌক্তিকতা” বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। তবে পরবর্তীতে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে আইজি মেটাল ইউনিয়ন এবং লোয়ার স্যাক্সনি রাজ্য সরকারের যৌথ প্রচেষ্টায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। শ্রমিক প্রতিনিধিরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, তারা অত্যন্ত দায়িত্বশীলভাবে কাজ করেছেন এবং কোনো কারখানা বন্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিলেও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার জন্য এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।