ঘুড়ির সুতো না ঘাতক ব্লেড! জিটি রোডে গলা কাটল পুরোহিতের, চিনা মাঞ্জার রক্তখেলায় থমকে গেল ব্যান্ডেল!

সামনেই উৎসবের মরসুম আর তার আগেই বাংলার আকাশ ছেয়ে যাচ্ছে মারণ ঘুড়ির সুতোয়। আর এই চিনা মাঞ্জা সুতোর খপ্পরে পড়ে ফের এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সাক্ষী থাকল হুগলি জেলা। চিনা মাঞ্জা সুতোয় গলা কেটে অল্পের জন্য মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেন এক বাইক আরোহী। পেশায় পুরোহিত ওই ব্যক্তির নাম হারাধন আচার্য, যিনি হুগলির চুঁচুড়া তালডাঙার বাসিন্দা। সোমবার সকালে প্রাত্যহিক কাজের প্রয়োজনে বাইক চালিয়ে চুঁচুড়া থেকে ব্যান্ডেলের দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু কে জানত, ব্যান্ডেলের শরৎ সরণীর জিটি রোডের ওপর তাঁর জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে এক ভয়ঙ্কর বিপদ।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বাইক চালিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ করেই ধারালো চিনা মাঞ্জা সুতো এসে পেঁচিয়ে ধরে তাঁর গলা। নিমেষে সুতোর টানে গভীর ক্ষত তৈরি হয় এবং রক্তাক্ত অবস্থায় বাইক থেকে রাস্তায় ছিটকে পড়ে যান হারাধনবাবু। এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখে তাঁর ঠিক পেছনেই থাকা এক স্কুটার চালক দ্রুত ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়েন। এরপর স্থানীয় বাসিন্দারা সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে দ্রুত ছুটে আসেন এবং আহত পুরোহিতকে উদ্ধার করে তড়িঘড়ি চুঁচুড়া জেলা হাসপাতালে ভর্তি করেন। বড় ধরনের বিপদ এড়াতে স্থানীয়রাই জিটি রোডের ওপর ছড়িয়ে থাকা মারণ চিনা মাঞ্জা সুতো টেনে গুটিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেন। স্থানীয়দের ক্ষোভ, এর আগেও এই একই জায়গায় একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে এই প্রাণঘাতী সুতোর অবাধ বিক্রি কিছুতেই থামছে না।
আহত হারাধন আচার্য হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বলেন, “বাইকে করে ব্যান্ডেলে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ গলায় প্রচণ্ড টান অনুভব করলাম। বুঝতেই পারিনি যে সুতোয় গলা এতটা কেটে গিয়েছে। চিনা মাঞ্জা সুতো যে কতটা ধারালো, তা আজ হাড়ে হাড়ে টের পেলাম।” পিছন থেকে আসা স্কুটার চালক হারাধন রায় জানান, “আমি ওই বাইকটির ঠিক পিছনেই আসছিলাম। হঠাৎ দেখি উনি বাইক থামিয়ে রাস্তায় পড়ে গেলেন। কাছে গিয়ে দেখি ঘুড়ির সুতোয় গলা কেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। প্রশাসনের কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ, অবিলম্বে এই সুতো বিক্রি চিরতরে বন্ধ করা হোক।”
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সবুজ মঞ্চ’-এর পক্ষ থেকেও প্রশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেওয়া হয়েছে। সংগঠনের আহ্বায়ক গৌতম সরকার জানান, চিনা মাঞ্জা সুতোর কারণে দীর্ঘদিন ধরেই আকছার দুর্ঘটনা ঘটছে এবং চুঁচুড়া ও শ্রীরামপুর-সহ বিভিন্ন শহরে বহু মানুষ গুরুতর আহত হচ্ছেন। তিনি অভিযোগ করেন, শুধু মানুষই নয়, এই সুতো গাছে আটকে থেকে অসংখ্য পাখি মারা যাচ্ছে এবং পথচলতি পশুরাও সমানভাবে জখম হচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে পুকুরে জাল ফেলার কাজেও বেআইনিভাবে এই সুতো ব্যবহার করা হচ্ছে।
এদিকে, চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের এক দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক জানিয়েছেন, মারণ চিনা মাঞ্জার বিরুদ্ধে পুলিশ যথেষ্ট তৎপর রয়েছে এবং কমিশনারেট জুড়ে নিয়মিত ধরপাকড় চলছে। যেখানেই এই সুতো বিক্রির খবর মিলছে, সেখান থেকেই তা বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। অন্যদিকে, চুঁচুড়ার বিধায়ক সুবীর নাগ কড়া ভাষায় আশ্বাস দিয়ে বলেন, “চিনা মাঞ্জার বাড়বাড়ন্ত রুখতে বর্তমান সরকারের তরফে ইতিমধ্যে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ধরপাকড় আরও জোরদার করার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে এই চিনামাঞ্জা বিক্রি পুরোপুরি চিরতরে বন্ধ করতে আমরা কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।”