ফর্ম হারানো যশস্বীর আগুনে কামব্যাক! নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ডাবল সেঞ্চুরির ঠিক আগে কী করলেন ভারতীয় ওপেনার?

দীর্ঘদিনের অফ-ফর্ম এবং নামের প্রতি সুবিচার করতে না পারার চরম মানসিক চাপ কাটিয়ে অবশেষে চেনা ছন্দে ফিরলেন ভারতের তারকা ওপেনার যশস্বী জয়সোয়াল। নিউজিল্যান্ড ‘এ’ দলের বিরুদ্ধে সিরিজের দ্বিতীয় বেসরকারি টেস্ট ম্যাচে ব্যাট হাতে দুর্দান্ত এক অপরাজিত শতরান করে খবরের শিরোনামে চলে এলেন এই বাঁ-হাতি ব্যাটার। তাঁর মারকাটারি ১৫৫ রানের অনবদ্য ও দায়িত্বশীল ইনিংসের সৌজন্যেই প্রথম ইনিংসে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে থেকেও ম্যাচটি ড্র করতে সক্ষম হয়েছে ভারত ‘এ’ দল। মঙ্গলবার নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে অবস্থিত ঐতিহাসিক হ্যাগলি ওভালে শেষ হওয়া এই টানটান উত্তেজনার ম্যাচে যশস্বীর পাশাপাশি সমান্তরালভাবে শতরান পেয়েছেন তরুণ ব্যাটার যশ রাঠোরও। এই দুই যশের অবিচ্ছিন্ন ২৪৭ রানের অনবদ্য জুটিতে ভর করেই দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে ২৮২ রান তোলে ভারত ‘এ’। এরপরই দুই দলের অধিনায়করা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে ম্যাচ ড্র ঘোষণা করেন। দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১৬২ বল মোকাবিলা করে ১৫৫ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেন যশস্বী, যার মধ্যে সাজানো ছিল ১৫টি চোখ ধাঁধানো চার ও ৫টি বিশাল ছক্কা। অন্যদিকে, সমানতালে লড়াই চালিয়ে ১২২ বলে অপরাজিত ১০০ রানের দারুণ এক ইনিংস উপহার দেন যশ রাঠোর। তৃতীয় উইকেটে তাঁদের এই ২৪৭ রানের অবিচ্ছিন্ন পার্টনারশিপ শুধু ভারতকে নিশ্চিত হারের মুখ থেকেই বাঁচায়নি, বরং প্রতিপক্ষের প্রথম ইনিংসে থাকা লিডও সম্পূর্ণ মুছে দেয়। ম্যাচ শেষ হওয়ার সময় ভারত ‘এ’ দলের লিড দাঁড়িয়েছিল ২০৪ রানে।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ক্রিকেটে যশস্বীর ব্যাট একেবারেই কথা বলছিল না, ফলে এই শতরান তাঁর কেরিয়ারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এল। কিউইদের বিরুদ্ধে চলতি সিরিজের প্রথম বেসরকারি টেস্টের দুই ইনিংসে তাঁর ব্যাট থেকে মাত্র ১৭ ও ৫ রান এসেছিল। এমনকি এই দ্বিতীয় ম্যাচের প্রথম ইনিংসেও তিনি খাতা খুলতে পারেননি (শূন্য রান)। কিন্তু সব ব্যর্থতা ও সমালোচনার জবাব দিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে একেবারে অন্য মেজাজে ধরা দেন এই ওপেনার। মাত্র ১১৯ বলে নিজের শতরান পূর্ণ করার পর তিনি আরও বেশি আগ্রাসী হয়ে ওঠেন এবং বোলারদের নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ১৫৫ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন তিনি। অন্যদিকে, যশস্বীকে যোগ্য ও নির্ভরযোগ্য সঙ্গত দিয়ে যান যশ রাঠোর। শুরু থেকে ঠান্ডা মাথায় অত্যন্ত ধৈর্য ধরে ব্যাট করে ১২২ বলে নিজের সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি। চতুর্থ দিনের খেলা শুরু হতেই সাই সুদর্শন (১১) এবং দেবদত্ত পাড়িক্কল (০) দ্রুত সাজঘরে ফিরে গেলে ভারত বড় বিপদে পড়েছিল, কিন্তু এরপর যশ ও যশের জুটি আর কোনো বিপর্যয় ঘটতে দেয়নি। এর আগে ম্যাচের প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ভারত ‘এ’ দল সব উইকেট হারিয়ে ৩১০-এর বেশি, অর্থাৎ ৩৪৬ রান সংগ্রহ করেছিল। সেই ইনিংসে দলের হয়ে সর্বোচ্চ ১০৫ রানের অসাধারণ এক ইনিংস খেলেন ধ্রুব জুরেল। ১৭১ বলের সেই ধৈর্যশীল ইনিংসে ছিল একাধিক নান্দনিক শট। এছাড়া দেবদত্ত পাড়িক্কল ১৪০ বলে মূল্যবান ৮০ রান এবং অভিজ্ঞ বোলার আকাশ দীপ ১১৬ বলে ঝোড়ো ৬৮ রান করেন। সাই সুদর্শন অবদান রাখেন ৪১ রান। নিউজিল্যান্ড ‘এ’ দলের হয়ে বোলিংয়ে দারুণ সাফল্য পান ফ্রেজার শিট, যিনি ৬৩ রানের বিনিময়ে ৪টি উইকেট শিকার করেন। এছাড়া ব্রেট র্যান্ডেল ৬৬ রান খরচ করে নেন ২টি উইকেট। জবাবে প্রথম ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে শক্তিশালী ৪২৪ রান তোলে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ড ‘এ’ দল, যার ফলে তারা প্রথম ইনিংসের নিরিখে ৭৮ রানের গুরুত্বপূর্ণ লিড অর্জন করে নেয়। কিউইদের হয়ে ম্যাথিউ বয়েল দুর্দান্ত ১১০ রানের একটি ম্যাচ জেতানো ইনিংস খেলেন। ১৫২ বলের সেই ইনিংসে তিনি দলের ভিত শক্ত করেন। মাত্র সাত রানের জন্য অল্পের জন্য শতরান হাতছাড়া করেন ডিন ফক্সক্রফট, যিনি ২২৬ বল খেলে ৯৩ রানের দীর্ঘ ইনিংস খেলেন। এছাড়া ক্রিশ্চিয়ান ক্লার্ক (৪১), ফ্রেজার শিট (৪০) এবং জ্যারড ম্যাকে (৩৩) দলের স্কোরবোর্ডে মূল্যবান রান যোগ করেন।
এই ম্যাচে ভারতীয় বোলিং লাইনআপের অন্যতম বড় প্রাপ্তি ছিলেন অভিজ্ঞ পেসার মুকেশ কুমার। প্রথম ইনিংসে বল হাতে আগুনে পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে তিনি নিউজিল্যান্ডের ব্যাটারদের কোণঠাসা করে রাখেন। দীর্ঘ ২৯ ওভার বল করে মাত্র ৮৭ রান খরচ করে তিনি একাই তুলে নেন ৫টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। অন্যদিকে, তারকা পেসার মহম্মদ সিরাজ ৪টি উইকেট পেলেও কিছুটা খরুচে ছিলেন এবং ১১৮ রান খরচ করেন। বাকি একটি উইকেট আসে স্পিনার ওয়াশিংটন সুন্দরের ঝুলিতে। সব মিলিয়ে, প্রথম ইনিংসে পিছিয়ে পড়েও যশস্বী ও রাঠোরের দুর্দান্ত ব্যাটিং এবং মুকেশের বোলিংয়ের সুবাদে দারুণভাবে কামব্যাক করল ভারত ‘এ’। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, যশস্বীর এই দুর্দান্ত শতরান জাতীয় দলের দরজা তাঁর জন্য ফের প্রশস্ত করতে পারে এবং আসন্ন বড় সিরিজের আগে এটি অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক।