“এমন সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা কীভাবে সম্ভব?” সিজেপির দিল্লি মার্চ রুখতে কড়াকড়ি নিয়ে শীর্ষ আদালতে চরম অস্বস্তিতে কেন্দ্র

এসআইআর (SIR) বিতর্ক এবং ‘ভোট চুরি’-র গুরুতর অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র শনিবারের দিল্লি চলো অভিযান ঘিরে রাজধানীতে তৈরি হওয়া নজিরবিহীন প্রশাসনিক কড়াকড়ি ও নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার শুনানিতে আজ এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরল দেশের শীর্ষ আদালত। শুক্রবার ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর সমন্বিত বেঞ্চ জানিয়েছে যে, একদিকে যেমন সাধারণ নাগরিকদের অহিংস প্রতিবাদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করা অপরিহার্য, তেমনই অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক পরিষেবা ও স্বাভাবিক যাতায়াতের সুবিধাকেও অগ্রাধিকার দেওয়া আবশ্যক। এই দুটি সাংবিধানিক বিষয়ের মধ্যে একটি সুস্থ ও সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা—উভয়ের পক্ষ থেকেই অত্যন্ত জরুরি।
এদিন সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে আবেদনকারীদের পক্ষে সওয়াল করতে হাজির হয়েছিলেন দেশের আইনি মহলের তাবড় প্রবীণ আইনজীবীরা। কপিল সিবাল, অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি, প্রশান্ত ভূষণ এবং বৃন্দা গ্রোভারের মতো প্রবীণ আইনজীবীদের সমন্বয়ে গঠিত শক্তিশালী টিম পুলিশ ও প্রশাসনের জারি করা ঢালাও নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁরা আদালতের সামনে যুক্তি দিয়ে জানান যে, দিল্লির একাধিক মেট্রো স্টেশন আকস্মিক বন্ধ রাখা, দূরপাল্লার ট্রেন বাতিল করা, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে கடுமையான বিধিনিষেধ আরোপ করা এবং হোটেল ও রেসিডেন্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (RWA)-গুলিকে একের পর এক নির্দেশিকা পাঠিয়ে সাধারণ মানুষকে দিল্লিতে একত্রিত হতে অন্যায্যভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে। সিনিয়ার অ্যাডভোকেট কপিল সিবাল সরাসরি প্রশ্ন তোলেন যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গোটা রাজধানী অঞ্চল জুড়ে এই ধরনের সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা প্রশাসন কীভাবে জারি করতে পারে? অন্যদিকে, আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি সওয়াল করেন যে, এখনও পর্যন্ত কোনো ধরনের অপ্রীতিকর প্রশাসনিক বা আইনশৃঙ্খলাজনিত অঘটন না ঘটা সত্ত্বেও এই মাত্রার আগাম কড়াকড়ির কোনো আইনগত যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।
বিপরীতে, কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা প্রশাসনের এই কঠোর ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার সপক্ষে জোরালো যুক্তি দেন। তিনি দাবি করেন যে, রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রাখা এবং লাখ লাখ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিরবচ্ছিন্ন রাখতেই এই সমস্ত আগাম নিরাপত্তা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে উভয় পক্ষের দীর্ঘ ও তথ্যবহুল সওয়াল-জওয়াব শোনার পর বেঞ্চ মন্তব্য করে যে, এই ধরনের ঢালাও বিধিনিষেধ সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। মামলার শুনানিতে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী তাঁর প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট জানান যে, পুলিশ ও প্রশাসনের হাতে থাকা তথ্যাদির ভিত্তিতে এ ধরনের পদক্ষেপ বেশ “অসামঞ্জস্যপূর্ণ” বলেই মনে হচ্ছে। বিচারপতি বাগচী উল্লেখ করেন, যাঁরা প্রতিবাদে অংশ নিতে চাইছেন তাঁদের মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি সাধারণ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক পরিষেবা পাওয়ার অধিকারের মধ্যে একটি সংবেদনশীল ভারসাম্য বজায় রাখা প্রশাসনের প্রাথমিক দায়িত্ব। শনিবারের এই জটিল ও উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে শীর্ষ আদালতের দুপুর ২টোর পরবর্তী শুনানি এবং সম্ভাব্য মধ্যবর্তী নির্দেশিকার দিকেই এখন সারা দেশের নজর আটকে রয়েছে।