এনকাউন্টারে অপরাধীর মৃত্যু! কিন্তু পুলিশ চাইলেই কি গুলি চালাতে পারে? আসল সত্যিটা জানলে চমকে যাবেন

রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর ফের পুলিশি এনকাউন্টারে এক ধর্ষণে অভিযুক্তের মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে পশ্চিমবঙ্গে দুটি এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটল। তবে এই প্রবণতা কেবল পশ্চিমবঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়, দেশজুড়েই বিভিন্ন সময়ে এনকাউন্টারের নজির দেখা গেছে।

সাধারণত পুলিশের পক্ষ থেকে আত্মরক্ষার তাগিদে গুলি চালানোর কথা বলা হলেও, আইন বা আদালত সেই দাবিকে অন্ধভাবে মেনে নেয় না। ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং ফরেনসিক রিপোর্টের মতো কড়া বৈজ্ঞানিক প্রমাণ খতিয়ে দেখেই বিচার করা হয়—পুলিশের নেওয়া পদক্ষেপ আইনসম্মত ছিল, নাকি তার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বন্দুকের নল থেকে গুলি বের হওয়ার পর ঠিক কী কী আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পুলিশকে যেতে হয়?

এনকাউন্টারের পর কী কী তদন্ত বাধ্যতামূলক?

২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক ‘পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ’ (PUCL) বনাম মহারাষ্ট্র সরকার মামলার নির্দেশিকা এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (NHRC) নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি পুলিশি এনকাউন্টারের পর নির্দিষ্ট কিছু আইনি পদক্ষেপ নেওয়া বাধ্যতামূলক:

  • ১. এফআইআর (FIR) দায়ের: এনকাউন্টারে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই তা আইনি খাতায় নথিভুক্ত করতে হয়। পুলিশের পদক্ষেপে কোনো অপরাধমূলক উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করা হয়।

  • ২. নিরপেক্ষ সংস্থার তদন্ত: যে পুলিশ দলটি এনকাউন্টারে সরাসরি অংশ নিয়েছিল, তারা নিজেদের মামলার তদন্ত করতে পারে না। নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে অন্য কোনো স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থাকে দিয়ে গোটা ঘটনার তদন্ত করানো হয়।

  • ৩. ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্ত: পুলিশি গুলিতে কারও মৃত্যু হলে সেখানে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত করা আইনত বাধ্যতামূলক। কী পরিস্থিতিতে এবং কোন বাধ্যবাধকতায় গুলি চালানো হয়েছিল, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখা হয়।

  • ৪. ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষা: মৃতদেহের ময়নাতদন্তের পাশাপাশি গুলির আঘাতের ধরণ, গুলির গতিপথ, ব্যবহৃত অস্ত্র ও কার্তুজের ফরেনসিক বিশ্লেষণ করা হয়। ঘটনার সময় উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীদের আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে বক্তব্য রেকর্ড করা হয়।

  • ৫. মানবাধিকার কমিশনকে (NHRC) রিপোর্ট জমা: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশ, যেকোনো এনকাউন্টার মৃত্যুর খবর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কমিশনকে জানাতে হবে। পরবর্তী সময়ে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার চূড়ান্ত রিপোর্ট সেখানে জমা দিতে হয়।

জিডি এন্ট্রি থেকে পোস্টমর্টেম: তদন্তের অন্দরের কথা

তদন্তকারীরা কেবল ঘটনাস্থল নয়, বরং থানার খাতাপত্রও খতিয়ে দেখেন। এনকাউন্টারের দিন পুলিশকর্মী যখন থানা থেকে বের হয়েছিলেন, তখন বন্দুক নেওয়ার পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল এবং সাধারণ ডায়েরিতে (GD Entry) কী কারণ দর্শানো হয়েছিল—তা বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হয়।

এনকাউন্টারের পরই কি পুলিশকর্মীরা সাসপেন্ড হন?

সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে এনকাউন্টার হলেই বুঝি পুলিশকর্মীদের বরখাস্ত করা হয়। বিষয়টি একেবারেই তেমন নয়।

প্রতিটি এনকাউন্টারের পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারদের সাসপেন্ড করার কোনো নিয়ম নেই। তবে তদন্তে যদি কোনো অনিয়ম বা অপরাধ প্রমাণিত হয়, তবেই তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাশাপাশি, সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশ রয়েছে—এনকাউন্টারের সত্যতা সম্পূর্ণ যাচাই না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীদের তাৎক্ষণিক পদোন্নতি (Promotion) বা বীরত্বের পুরস্কার দেওয়া যাবে না।

‘অভিযুক্ত প্রথম গুলি চালিয়েছিল’—পুলিশের এই দাবি কতটা গ্রহণযোগ্য?

প্রায় প্রতিটি এনকাউন্টারের পর পুলিশের একটিই দাবি থাকে—অভিযুক্ত ব্যক্তি আগে গুলি চালিয়েছিল, ফলে আত্মরক্ষার্থেই পুলিশ পাল্টা গুলি চালাতে বাধ্য হয়।

তদন্তকারী সংস্থা এই দাবির মুখোমুখি হলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মেলায়:

  • অভিযুক্তের কাছে সত্যিই কোনো বৈধ বা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ছিল কি না।

  • পুলিশ নিজেদের বা অন্য কোনো সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে গুলি চালিয়েছিল কি না।

  • পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের সত্যিই কোনো প্রয়োজন ছিল কি না।

  • পুলিশকর্মীদের দেওয়া বয়ানের সঙ্গে ফরেনসিক ও ব্যালিস্টিক রিপোর্টের মিল রয়েছে কি না।

আইন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আত্মরক্ষার অধিকার সবার থাকলেও তা সীমাহীন নয়। পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই ঠিক হয় সেই অধিকারের সীমা কতটা ছিল।