এক ধাক্কায় ১৪ জনের সদস্যপদ খারিজ! মালদায় মহকুমা প্রশাসনের বেনজির পদক্ষেপে বড়সড় ওলটপালট পঞ্চায়েতে

মালদার চাঁচল ২ ব্লকের ক্ষেমপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে এক নাটকীয় ও নজিরবিহীন প্রশাসনিক পদক্ষেপে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে এক ধাক্কায় ২৭ আসন বিশিষ্ট এই পঞ্চায়েতের ১৪ জন সদস্যের সদস্যপদ খারিজ করা হয়েছে। পঞ্চায়েতের ভাঙাগড়ার খেলা এবং দলীয় কোন্দলের জেরে এই বেনজির পদক্ষেপের ফলে বর্তমানে প্রধান এবং উপপ্রধান উভয়েই তাঁদের পদ হারিয়েছেন। এর জেরে ওই ১৪টি বুথের সাধারণ মানুষের নাগরিক পরিষেবা পাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে তীব্র অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা।
২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে এই ক্ষেমপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে ১৬টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। পাশাপাশি, বিরোধী দল হিসেবে বিজেপি ৮টি, কংগ্রেস ২টি এবং রেভলিউশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টি (RSP) ১টি আসনে জয়লাভ করেছিল। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরই শাসকদলের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। দলের বেশ কয়েকজন বিক্ষুব্ধ সদস্য বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং পঞ্চায়েত দখল করেন। সেই সময় তৃণমূলের শম্পারানি সিনহা প্রধান এবং বিজেপির বাসুদেব ভুঁইয়া উপপ্রধান পদে আসীন হন।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের জেরে তৃণমূল, বিজেপি ও কংগ্রেসের একটি বড় অংশ একত্রিত হয়ে তৎকালীন প্রধানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনে। গত ১৯ আগস্ট শম্পারানি সিনহাকে সরিয়ে তৃণমূলেরই অন্য এক সদস্য ছবি মণ্ডলকে নতুন প্রধান হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। তবে এই নতুন বোর্ড গঠনের রেশ কাটতে না কাটতেই মহকুমা প্রশাসনের এই কড়া পদক্ষেপ সব হিসেব নিকেশ ওলটপালট করে দেয়।
জানা গিয়েছে, পূর্ববর্তী প্রধান শম্পারানি সিনহা পঞ্চায়েতের নির্দিষ্ট সংখ্যক সাধারণ সভায় একটানা অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে আইনগত পদক্ষেপ হিসেবে ১৪ জন সদস্যের সদস্যপদ খারিজের দাবিতে মহকুমা শাসকের কাছে জোরালো আবেদন জানিয়েছিলেন। পঞ্চায়েত আইন অনুযায়ী, যথাযথ কারণ দর্শানো ছাড়া টানা নির্দিষ্ট সংখ্যক সভায় অনুপস্থিত থাকলে কোনো সদস্যের সদস্যপদ বাতিল করার পূর্ণ বিধান রয়েছে। সেই আইনি ধারাকে প্রয়োগ করেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এই ১৪ জন বরখাস্ত সদস্যের মধ্যে তৃণমূলের ৭ জন, বিজেপির ৬ জন এবং কংগ্রেসের ১ জন সদস্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। একসঙ্গে এতগুলি পদ শূন্য হয়ে যাওয়ায় এবং প্রধান ও উপপ্রধান উভয়েই বরখাস্ত হওয়ায় বাকি ১৩ জন সদস্যকে নিয়ে নতুন করে কীভাবে বোর্ড গঠিত হবে এবং শাসনকার্য পরিচালিত হবে, তা নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। এলাকার সাধারণ মানুষ এই নজিরবিহীন পরিস্থিতির কারণে সরকারি পরিষেবা ও উন্নয়নমূলক কাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় যথেষ্ট উদ্বিগ্ন।
এই রায়কে সত্যের জয় বলে অভিহিত করে অভিযোগকারী তৃণমূল সদস্য আব্দুল হক এবং প্রাক্তন প্রধানের স্বামী প্রদূত সিনহা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, আইনি দিক ব্যাখ্যা করে আইনজীবী হারুন আলি জানান যে প্রশাসনিক নিয়ম মেনেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। বিজেপির পক্ষ থেকেও স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে এটি সম্পূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং এর সঙ্গে দলীয় রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। আপাতত মহকুমা প্রশাসনের সরাসরি পরিচালনায় এই পঞ্চায়েতটি চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।