এক দিনে রেকর্ড গাড়ি ডেলিভারি! ধনতেরাস ও উৎসবের মরসুমে খুচরা বাজারে তুমুল জোয়ার, হাসি ফুটল ব্যবসায়ীদের মুখে

চলতি উৎসবের মরসুমে দেশের খুচরা বাজারে আশার আলো দেখল ব্যবসা ও বাণিজ্য মহল। ধনতেরাসের পবিত্র দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খুচরা দোকান এবং শোরুমগুলিতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে নতুন গাড়ি, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, পোশাক এবং জুতো কেনার হিড়িকে গ্রামীণ বাজার সহ দেশের নানাপ্রান্তে কোম্পানি ও খুচরা বিক্রেতারা বছরের সেরা একদিনের ব্যবসা করতে সক্ষম হয়েছেন। বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় সংস্থার আধিকারিকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নবরাত্রি থেকে শুরু হওয়া এই উৎসবের মরসুমে বেশিরভাগ বিভাগে মূল্যের দিক থেকে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত এবং পরিমাণের দিক থেকে ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত বিক্রি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনীতিতে এক নতুন প্রাণসঞ্চার করেছে।
বাজার সমীক্ষা এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলির রিপোর্ট অনুযায়ী, অনলাইন অর্ডারের পরিমাণও ২০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সামগ্রিক বাজারের এই ইতিবাচক ছবির মধ্যেও কিছু ক্ষেত্রে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। যেমন—খুচরা বিক্রেতাদের একাংশের মতে, স্মার্টফোন, স্মার্ট টিভি এবং ল্যাপটপের বিক্রি সামান্য ধাক্কা খেয়েছে। চলতি বছর এই গ্যাজেটগুলির দাম প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় একক বিক্রির পরিমাণ ১৫ শতাংশের মতো কমেছে, যদিও সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে আয়ের দিক থেকে সামান্য ১০ শতাংশ বৃদ্ধি দেখা গেছে। এর বিপরীতে অটোমোবাইল সেক্টরে চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা এবং অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
অটোমোবাইল খাতে বিশেষ করে উত্তর ভারতে ব্যাপক সাফল্যের চিত্র সামনে এসেছে। ফেডারেশন অফ অটোমোবাইল ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনস (ফাডা)-এর তথ্য অনুযায়ী, উত্তর ভারতের গাড়ি ডিলাররা কেবল ধনতেরাসের দিনেই গ্রাহকদের হাতে প্রায় এক মাসের সমপরিমাণ যানবাহন সরবরাহ করেছেন। গত বছর জিএসটি হার সংশোধনের পর বিক্রি এক ধাক্কায় ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় তুলনামূলক ভিত্তি (High Base) বেশ উঁচুতে ছিল। তা সত্ত্বেও চলতি উৎসবের মরসুমে গাড়ির বিক্রি আগের বছরের উচ্চ স্তরের কাছাকাছি থাকায় বাজার বিশেষজ্ঞরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ফাডার সভাপতি সাই গিরিধর জানিয়েছেন যে, এই স্থিতিশীল চাহিদাই ভারতীয় ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা ও আগ্রহের প্রমাণ দেয়।
দেশের বৃহত্তম গাড়ি নির্মাতা মারুতি সুজুকি ইন্ডিয়া জানিয়েছে যে, গণেশ চতুর্থী থেকে ধনতেরাসের মধ্যবর্তী সময়ে তাদের খুচরা বিক্রি ১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে সরাসরি ৪ লক্ষ ইউনিটে পৌঁছে গেছে। বর্তমানে কোম্পানিটির ঝুলিতে ২ লক্ষ ৫৩ হাজার গাড়ির বিশাল ব্যাকলগ অর্ডার জমা রয়েছে। মারুতি সুজুকির মার্কেটিং ও সেলস বিভাগের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার পার্থ ব্যানার্জী জানিয়েছেন, কেবল ধনতেরাস উৎসবের দিনটিতেই কোম্পানি ৩০,০০০-এর বেশি গাড়ি সফলভাবে ডেলিভারি দিয়েছে। গত বছর ধনতেরাস দুদিনব্যাপী হওয়ায় ডেলিভারির সংখ্যা কিছুটা বেশি (৫০,০০০) থাকলেও, এ বছর ১৪ নভেম্বর লাভ পঞ্চম পর্যন্ত সামগ্রিক ডেলিভারির নিরিখে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বড় প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে বলে তাঁরা আশাবাদী। পাশাপাশি চাহিদা তুঙ্গে থাকায় তাঁদের প্রায় সব জনপ্রিয় মডেলের জন্যই দীর্ঘ অপেক্ষার সময় (Waiting Period) বজায় রয়েছে।
হোম অ্যাপ্লায়েন্স এবং ইলেকট্রনিক্স সেক্টরেও বড় ধরনের স্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে। দেশের অন্যতম বৃহত্তম হোম অ্যাপ্লায়েন্স প্রস্তুতকারক এলজি ইলেকট্রনিক্স ইন্ডিয়া মূল্যের দিক থেকে দুই অঙ্কের শক্তপোক্ত প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। অন্যদিকে, গডরেজ অ্যাপ্লায়েন্সেসের মতো শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলির ক্ষেত্রে বিক্রির মূল্য ৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া হায়ার ইন্ডিয়া প্রায় ৩০ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি এবং ১০ শতাংশ পরিমাণগত প্রবৃদ্ধি নথিভুক্ত করেছে। মূল্যস্ফীতি, অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কর্মসংস্থানের নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও উৎসবের মরসুমে সাধারণ মানুষের এই কেনাকাটার জোয়ার খুচরা বিক্রেতা ও প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলির মুখে চওড়া হাসি ফুটিয়েছে।