উৎসবের মরশুমে হু হু করে বাড়ছে চিনির দাম! এক ধাক্কায় রেশনের নিয়ম চালু করতেই দেশজুড়ে হাহাকার!

দেশের প্রধান উৎসবের মরসুম আসন্ন। আর ঠিক এমন এক সংকটময় মুহূর্তে দেশজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র চিনির আকাল। সরবরাহ ঘাটতির নজিরবিহীন সংকটের কারণে ডি-মার্টের মতো নামী রিটেল চেইন থেকে শুরু করে বিগবাস্কেট, ব্লিংকিট ও সুইগি ইন্সটামার্টের মতো জনপ্রিয় ইনস্ট্যান্ট কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো গ্রাহকদের চিনি কেনার ওপর কঠোর রেশনিং বা সীমারেখা আরোপ করতে বাধ্য হয়েছে। গত মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে চিনির খুচরা মূল্য এক লাফে প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের পকেটে বড়সড় টান পড়েছে। এই লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং মজুত ধরে রাখতে কিছু খুচরা বিক্রেতা গ্রাহকদের প্রতি চালানে ক্রয়ের পরিমাণ ৩ থেকে ৫ কেজির মধ্যে কঠোরভাবে সীমিত করে দিয়েছে।
উৎসবের ঠিক প্রাক্কালে এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় প্যাকেটজাত খাদ্য প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলো চরম বিপাকে পড়েছে। চিনির পাশাপাশি রান্নার তেলের লাগাতার চড়া দামও কোম্পানিগুলোর লাভের মার্জিনের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় ফুড ব্র্যান্ডগুলো তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম অন্তত ৫ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, চিনির বাজারদর যদি আগামী দিনেও এই উচ্চ স্তরে বজায় থাকে, তবে মধ্যবিত্তের হেঁসেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও আকাশছোঁয়া হয়ে উঠবে। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় স্ন্যাক্স প্রস্তুতকারক সংস্থার প্রধান স্বীকার করেছেন যে, উৎপাদন খরচ সামাল দিতে তাঁদের সামনে পণ্যের দাম ৫ শতাংশ বাড়ানো ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।
মূল্যবৃদ্ধির এই ভয়ঙ্কর সংকটের নেপথ্যে রয়েছে একাধিক চাঞ্চল্যকর কারণ। মূলত প্রাথমিক অনুমানের তুলনায় এ বছর দেশজুড়ে চিনির উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর পাশাপাশি প্রায় ৮ লক্ষ টন চিনি বিদেশে রপ্তানি করা এবং কিছু অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ীর ইচ্ছাকৃত মজুতদারি পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। ইন্ডিয়ান সুগার অ্যান্ড বায়ো-এনার্জি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (ISMA)-র মতো দেশের প্রধান শিল্প গোষ্ঠীগুলোর ভুল উৎপাদন অনুমান এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি রুখতে গত সপ্তাহে কেন্দ্র সরকার জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ১০ লক্ষ টন চিনি আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। ইকোনমিক টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের অধিকাংশ রিটেল চেইন এবং কুইক কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের বর্তমান মজুত অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রতি ক্রেতাকে সর্বোচ্চ দুটি বা তিনটি ১ কেজির প্যাকেট অথবা একটি মাত্র ৫ কেজির প্যাকেটে সীমাবদ্ধ রাখছে। উদাহরণস্বরূপ, দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলে ব্লিংকিট প্ল্যাটফর্মটি মাওয়ানা প্রিমিয়াম ক্রিস্টাল এবং ধামপুর ক্রিস্টাল হোয়াইট সুগারের মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর ক্ষেত্রে প্রতি লেনদেনে ৫ কেজির বেশি প্যাক বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। একই সঙ্গে অ্যাপে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে সীমিত মজুতের কারণে গ্রাহকদের এই নিয়ম মানতে হবে।
পুনে শহরের ব্লিংকিট অ্যাপে গ্রাহকদের শপিং কার্টে কেবল তিনটি ১-কেজির প্যাক যোগ করার অনুমতি মিলছে, যেখানে বিগবাস্কেট নির্দিষ্ট কিছু ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে কেনাকাটা ৫টি ১-কেজির প্যাকে আটকে রেখেছে। অন্যদিকে, দিল্লি-এনসিআর-এর সুইগি ইন্সটামার্ট সুপ্রিম হারভেস্ট এবং মধুর সুগারের মতো ব্র্যান্ডগুলোর ক্ষেত্রে মাত্র দুটি ১-কেজির প্যাকের কড়া সীমা বেঁধে দিয়েছে। সুপারমার্কেট জায়ান্ট ডি-মার্টের পুনে শাখার আউটলেটগুলোতে বোর্ডে স্পষ্ট করে লিখে দেওয়া হয়েছে যে, একজন ক্রেতা প্রতি ইনভয়েসে সর্বাধিক ৫ কেজি চিনি কিনতে পারবেন।
এই চরম সংকটের শেকড় প্রোথিত রয়েছে গত বছরের সরকারি নীতিতে। দেশের উদ্বৃত্ত মজুত ও দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার আশঙ্কায় ভারত সরকার অতীতে মোট ২০ লক্ষ টন চিনি রপ্তানির অনুমতি দিয়েছিল, যার মধ্যে নভেম্বরে ১৫ লক্ষ ও ফেব্রুয়ারিতে ৫ লক্ষ টন অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় মে মাসে সরকার তড়িঘড়ি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। জুনের প্রথম সপ্তাহে যেখানে মিল পর্যায়ে চিনির দাম প্রতি কেজি ৪১ টাকা থেকে লাফিয়ে ৬৫ টাকায় পৌঁছেছিল, সরকারি হস্তক্ষেপে তা সামান্য কমে বর্তমানে ৫৮ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে আগামী দিনে আসন্ন উৎসবের মরসুমে এই বাড়তি মূল্য সরাসরি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপতে চলেছে বলে খাদ্য প্রস্তুতকারকরা নিশ্চিত করেছেন।