উৎসবের মরশুমে কি মিষ্টিমুখের আনন্দ ফিকে হবে? দেশের ঘাটতি মেটাতে আসছে আমদানির বিশাল চালান

গত এক মাসে ভারতীয় বাজারে চিনির দামে মারাত্মক ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। জুলাই মাসে যে চিনি প্রতি কেজি ৪৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, তা বর্তমানে মুম্বাই ও কলকাতায় লাফিয়ে বেড়ে ৫৮ থেকে ৬০ টাকা এবং কোথাও কোথাও প্রতি কেজি ৭০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে। এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে উৎসবের বাড়তি চাহিদা এবং মজুতদারির মতো কারণগুলিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। বাজারে এই সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল থেকে বিশাল পরিমাণে চিনি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিল থেকে আমদানির প্রথম চালানটি আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে ভারতেই এসে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে চিনির বিশ্ববাজার এবং ব্রাজিলের উৎপাদন ব্যবস্থার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মার্কিন কৃষি বিভাগের ২০২৬ সালের মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ব্রাজিলের চিনি উৎপাদন প্রায় ৪২.৫ মিলিয়ন টনে পৌঁছাতে পারে, যা বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ। বিশ্বজুড়ে মোট ১৮৪.৯ মিলিয়ন টন উৎপাদনে ব্রাজিলের অংশীদারিত্ব সবচেয়ে বেশি। দেশটির উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু, বিশাল আখের খেত, উন্নত কৃষি প্রযুক্তি এবং আধুনিক চিনিকল নেটওয়ার্ক উৎপাদনকে অনেক বেশি লাভজনক করে তুলেছে।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ব্রাজিলের চিনিকলগুলো আখ থেকে একই সঙ্গে চিনি এবং ইথানল—উভয় পণ্যই উৎপাদন করে। বাজারে চিনির দাম বাড়লে চিনিকলগুলি চিনির উৎপাদন বাড়ায়, আবার জ্বালানির চাহিদা থাকলে ইথানল উৎপাদনে জোর দেয়। এই বাণিজ্যিক নমনীয়তা দেশটির অর্থনীতিকে এক অনন্য স্থায়িত্ব প্রদান করে। মার্কিন কৃষি বিভাগের অনুমান অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে ব্রাজিলের আখের একটি বড় অংশ ইথানল উৎপাদনের দিকে ঝুঁকতে পারে, যার ফলে চিনির উৎপাদন সামান্য কমলেও দেশটি বিশ্বের এক নম্বর উৎপাদক হিসেবে তার অবস্থান ধরে রাখবে।
রপ্তানির ক্ষেত্রেও ব্রাজিল বিশ্বজুড়ে শীর্ষস্থানে রয়েছে। এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার প্রায় ১৫০টিরও বেশি দেশে ব্রাজিল তাদের উৎপাদিত চিনি সরবরাহ করে থাকে। চীন, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, আলজেরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, মিশর এবং নাইজেরিয়ার মতো বড় দেশগুলি ব্রাজিল থেকে নিয়মিত চিনি আমদানি করে। দেশটিতে অভ্যন্তরীণ ভোগ তুলনামূলক কম থাকায় তাদের কাছে সবসময় একটি বিশাল রপ্তানিযোগ্য উদ্বৃত্ত থাকে। ২০২৬-২৭ সালে প্রায় ৩ কোটি ৩৬ লক্ষ টন চিনি রপ্তানির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখনই অন্যান্য প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলিতে ঘাটতি দেখা দেয়, তখনই ব্রাজিলের ওপর বৈশ্বিক নির্ভরতা বহুগুণ বেড়ে যায়। ভারতের এই নতুন আমদানির সিদ্ধান্ত দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চিনির দাম নিয়ন্ত্রণে কতটা সফল হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।