‘আমাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বিন্দুমাত্র বরদাস্ত নয়!’ হরমুজ প্রণালী ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে কি বড় যুদ্ধের মেঘ?

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাগাতার ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ এবং কঠোর অবরোধ যদি অবিলম্বে বন্ধ না করা হয়, তবে তেহরান পারস্য উপসাগর এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে সব ধরনের তেল রফতানি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিতে পারে। সোমবার এক অত্যন্ত কঠোর ও সর্তকবার্তায় এই হুশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাই। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি নিরাপত্তার বাজারে এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।

সামাজিক মাধ্যম এক্স (X)-এ প্রকাশিত নিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে রেজাই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তেহরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা যে অর্থনৈতিক আগ্রাসন ও অভিযান চালাচ্ছে, তাতে যদি বিশ্বের অন্য কোনো দেশ সমর্থন জোগায় বা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে, তবে ইরান সেই দেশগুলির পদক্ষেপকেও সরাসরি ‘যুদ্ধের শামিল হওয়া’ হিসেবেই গণ্য করবে। এর পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রধান জলপথের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর নজরদারি আরও সুদৃঢ় করতে ইরান আরও একটি বড় এবং তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপের ঘোষণা করেছে। রবিবার দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এখন থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী সমস্ত “অনুমোদিত” দেশের বাণিজ্যিক ও তেলের জাহাজগুলিকে তেহরান সরকারকে নির্দিষ্ট পরিষেবা ফি প্রদান করতে হবে।

জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের সরকারি মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, এই নতুন কাঠামোর আওতায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা, পরিবেশগত সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং লজিস্টিক বা পরিবহণ সহায়ক বিভিন্ন পরিষেবার খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি (IRIB)-এর পরিবেশিত তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর সার্বিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং নৌ-চলাচলের গতিপ্রকৃতি মসৃণ রাখতেই এই সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পদক্ষেপ অনুমোদন করেছে জাতীয় নিরাপত্তা কমিশন। ইব্রাহিম আরও ব্যাখ্যা করে বলেছেন যে, নেভিগেশন বা নৌ-চলাচলে প্রয়োজনীয় সহায়তা, পরিবেশগত নজরদারি ব্যবস্থা, নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষ জ্বালানি সরবরাহ, সামুদ্রিক বিমা, কঠোর নিরাপত্তা এবং ইরানের তরফ থেকে দেওয়া অন্যান্য বহুমুখী সুবিধার জন্যই এই ফি ধার্য করা হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইরান সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে এই ফি শুধুমাত্র মার্কিন ডলারে নয়, বরং রিয়াল অথবা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের অনুমোদিত অন্য যেকোনো বিকল্প মুদ্রায় পরিশোধ করা যাবে।

এর আগে শনিবার স্থানীয় সময় অনুসারে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজাই এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বলেছিলেন যে, হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ রয়েছে এবং বর্তমান ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আমেরিকা যতক্ষণ না তাদের বৈরী আচরণ ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের নীতি পরিবর্তন করছে, ততক্ষণ এই জলপথ বন্ধই রাখা হবে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানে সরাসরি হামলা চালানোর ক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যর্থ ও হতাশ হয়ে এখন এই অর্থনৈতিক অবরোধের পথ বেছে নিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা অন্ধের মতো বিশ্বাস করছেন যে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েই তেহরানকে সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে নতিস্বীকারে বাধ্য করা সম্ভব। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভুল বুঝিয়ে এই আশ্বাস দিয়েছিলেন যে অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমেই ইরান সরকারের পতন ঘটানো যাবে।

অন্যদিকে, এই চরম কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালীকে একটি মানচিত্রে ‘নতুন মার্কিন অঞ্চল’ হিসেবে প্রদর্শণ করে একটি বিতর্কিত ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছেন। এই আন্তর্জাতিক জলপথের ওপর মার্কিন একক নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য থাকার দাবিকে ট্রাম্প যেভাবে বারবার জোরালোভাবে সামনে আনছেন, তাতে তেহরানের শাসকগোষ্ঠীর ক্ষোভ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং যেকোনো মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা আন্তর্জাতিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।