আঘাত-ব্যথা তুচ্ছ! জয়নগরের মাজিদা লস্করের লড়াই, কাঁটা ভেদ করে গাছে ওঠেন প্রতিদিন, কেন এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশা বেছে নিলেন?

মহিলারা পারে না এমন কোনও অসাধ্য সাধন কাজ এ পৃথিবীতে নেই—সেই কথাই যেন আরও একবার প্রমাণ করলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার জয়নগরের মনিপুর বাঁশতলা এলাকার বাসিন্দা মাজিদা লস্কর। স্বামীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংসারের হাল ধরতে ১৫ বছর ধরে তিনি খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধছেন এবং জেলার প্রথম মহিলা শিউলি হিসেবে নিজের পরিচিতি গড়ে তুলেছেন।

সাধারণত শীতকালে খেজুর গাছের রস সংগ্রহ করার জন্য পুরুষরাই শিউলির কাজ করেন। কিন্তু স্বামীর পেশাকে সঙ্গী করেই জীবনের কঠিন সংগ্রামকে সহজ করে তুলেছেন মাজিদা। তাঁর স্বামী আব্দুর রউফ লস্কর ছোটবেলা থেকেই এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। বিবাহের পর থেকেই মাজিদা তাঁর স্বামীর সঙ্গে এই কাজে হাত লাগান এবং দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তিনি এখন একজন পাকা দস্তুর শিউলি হয়ে উঠেছেন।

রস সংগ্রহ থেকে নলেন গুড় তৈরি—একাই সামলান সব:

মাজিদা এখন শুধু গাছে হাঁড়ি বাঁধাই নয়, খেজুর গাছের রস সংগ্রহ থেকে শুরু করে সেই রস থেকে ঐতিহ্যবাহী নলেন গুড় তৈরি করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াতেই সিদ্ধহস্ত। এই দম্পতি মিলে প্রতিদিন এলাকার প্রায় ১৮০ থেকে ২০০টি খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করেন। জয়নগর এলাকার বেশ কয়েকটি প্রসিদ্ধ মোয়া দোকানে এই দম্পতির তৈরি নলেন গুড় সরবরাহ করা হয়।

মাজিদা লস্কর তাঁর সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে জানান, “সংসারের অভাব মেটানোর জন্য স্বামীর সঙ্গে এই কাজে যুক্ত হয়েছিলাম। প্রথমের দিকে বহু বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এই কাজ শিখতে গিয়ে বহু আঘাত সহ্য করেছি। খেজুর গাছের কাঁটা শরীরের বিভিন্ন জায়গায় চিরে দিয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে স্বামীর সহযোগিতায় আমি সমস্ত কিছু শিখেছি।” তিনি আরও যোগ করেন, এই শীতকালীন রোজগারের ফলেই তাঁদের সংসারের আর্থিক সংকট অনেকটাই দূর হয়।

স্বামী আব্দুর রউফ লস্কর তাঁর স্ত্রীর এই লড়াইকে কুর্নিশ জানিয়ে বলেন, “আমার স্ত্রী প্রথম আগ্রহ দেখিয়েছিল। আমি নিজে হাতে তাকে গাছ থেকে রস সংগ্রহ থেকে শুরু করে গুড় তৈরির সমস্ত প্রক্রিয়া শিখিয়েছি। ১৫ বছর ধরে সে আমার পাশে থেকে আমাকে সাহায্য করে যাচ্ছে। এতে আমার অনেক সাহায্য হয়েছে এবং সংসারের অর্থনৈতিক সংকট অনেকটা ঘুচে গিয়েছে।”

রউফ লস্কর স্বীকার করেন, এই শিউলির কাজ অত্যন্ত কষ্টসাধ্য এবং পরিমাণের তুলনায় লাভ কম হওয়ায় নতুন প্রজন্ম এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু মাজিদা লস্করের এই অদম্য স্পৃহা প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনও কাজই অসম্ভব নয়।