আকাশে মৃত্যুর হাতছানি! ককপিটে পাইলটের কোন মারাত্মক নেশা দেখে আঁতকে উঠলেন যাত্রীরা?

বিমানের প্রত্যেক যাত্রীরই একটি অবধারিত ও প্রাথমিক বিশ্বাস থাকে যে, হাজার হাজার ফুট উঁচুতে ককপিটে বসে থাকা পাইলট সম্পূর্ণ সজাগ, সুস্থ এবং বিমান পরিচালনার জন্য পুরোপুরি উপযুক্ত। কারণ, অতু্যচ্চ আকাশে সামান্য একটি ভুল বা অসাবধানতা শত শত যাত্রীর জীবনকে এক মুহূর্তে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারে। আর ঠিক এই কারণেই এবার ভারতের বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রক এবং ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল এভিয়েশন (ডিজিসিএ) পাইলটদের ডোপ পরীক্ষার প্রচলিত পদ্ধতিতে এক যুগান্তকারী ও কঠোর পরিবর্তনের পথে হাঁটার জোরালো প্রস্তুতি নিচ্ছে। বর্তমানে বিমান সংস্থাগুলিকে কেবলমাত্র ১০ শতাংশ পাইলটের ওপর দৈবচয়ন বা র‍্যান্ডম ডোপ টেস্ট করার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু সেই নিয়ম পুরোপুরি পাল্টে এবার থেকে দেশের প্রতিটি পাইলটের জন্য বছরে অন্তত একবার বাধ্যতামূলক ডোপ পরীক্ষা চালুর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সরকার।

সাম্প্রতিক সময়ে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফুকেট-দিল্লি ফ্লাইটকে ঘিরে ঘটা একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার পরই এই নিরাপত্তা নীতি পর্যালোচনার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। সরকারি মহলের মতে, নতুন নীতি প্রণয়ন ও রূপায়ণের সময় যেমন সাধারণ যাত্রীদের আকাশপথের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হবে, তেমনই এর ফলে বিমান সংস্থাগুলির দৈনন্দিন পরিচালনগত বা অপারেশনাল কার্যক্রমে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তাও গভীরভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। পুরোনো পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায় যে, এর আগেও বহুবার উড্ডয়নের আগে বা পরে করা বাধ্যতামূলক পরীক্ষায় একাধিক পাইলট ও ক্রু সদস্যের ডোপিং পরীক্ষায় পজিটিভ ধরা পড়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। বিগত লোকসভায় সরকারের পেশ করা এক লিখিত জবাব অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে মোট ১৮১ জন পাইলট ব্রেথালাইজার বা অ্যালকোহল ও ডোপ পরীক্ষায় পজিটিভ প্রমাণিত হয়েছিলেন। শুধুমাত্র ২০১৫ সালে ৪৩ জন, ২০১৬ সালে ৪৪ জন, ২০১৭ সালে ৪৫ জন এবং ২০১৮ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত ৪৯ জন পাইলট এই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়; পরবর্তীকালে ২০২২ সালের সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় মোট ২১০ জন পাইলট ও ক্রু সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরিসংখ্যান বলছে, গড়ে প্রতি সাত দিনে অন্তত একজন পাইলট এই ধরনের বাধ্যতামূলক পরীক্ষায় ফেল করছেন। বর্তমান নিয়মের ফাঁকফোকর গলে অনেক সময় কিছু পাইলট বছরের পর বছর ধরে যথাযথ তদন্ত বা কঠোর পরীক্ষার আওতার বাইরে থেকে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে যান, যা বিমানযাত্রীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বিশাল বড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দেয়। পুরোনো সেই তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৮ সালের বিভিন্ন পরীক্ষায় ১৮১ জনের পজিটিভ আসার পাশাপাশি ২০২০ সালে ২৭ জন পাইলট ও ৫৬ জন ক্রু সদস্য, ২০২১ সালে ১৯ জন পাইলট ও ৪০ জন ক্রু সদস্য এবং ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ১৪ জন পাইলট ও ৫৪ জন ক্রু সদস্য ড্রাগ বা অ্যালকোহল পরীক্ষায় ধরা পড়েছিলেন। যদিও সরকার সেসময় স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, নির্দিষ্ট মেয়াদে ২১০ জন পাইলট ও ক্রু সদস্যকে সাময়িকভাবে সাসপেন্ড বা বরখাস্ত করা হলেও তাঁদের লাইসেন্স পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি।

মূলত গত ৪ আগস্ট এয়ার ইন্ডিয়ার এআই-২৩৭৯ নম্বরের ফুকেট-দিল্লি ফ্লাইটটি আকাশে ওড়ার সময় মারাত্মক ঝাঁকুনি এবং হঠাৎ উচ্চতা হ্রাসের বা এয়ার পকেটের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার পরই এই ডোপ টেস্ট সংক্রান্ত নীতিটি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। ওই ঘটনার পরেই সংশ্লিষ্ট পাইলটের ডোপ টেস্টের নমুনা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়। এই মর্মান্তিক ও বিপজ্জনক ঘটনার পরেই সরকার তার существу ডোপ পরীক্ষা নীতি কঠোর করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছে। এদিকে, এই ঘটনার পর এয়ার ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ নিজেদের উদ্যোগে সমস্ত পাইলটের জন্য এককালীন বাধ্যতামূলক ডোপ পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে, যা ডিজিসিএ-র তৎকালীন সাধারণ র‍্যান্ডম পরীক্ষার নিয়মকে অনেকটাই ছাড়িয়ে গেছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে শতভাগ পাইলটের বাধ্যতামূলক বার্ষিক ডোপ পরীক্ষা চালুর মাধ্যমে আকাশপথের যাত্রীদের নিরাপত্তা কতটা সুনিশ্চিত হয়।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty